360 x 130 ad code [Sitewide - Site Header]

রাজনীতির বলির পাঁঠা

Share via email

কর্ণ বিক্রমাদিত্য

আজকের যুগে আমেরিকা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে বিভিন্ন দেশে। এটা দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক ‘ক্রসফায়ারের’ মত – সবাই জানে আসল ঘটনা কী, কিন্তু তারপরও ক্ষমতাধর পক্ষ সেই একই ভাঙ্গা রেকর্ড বাজিয়ে যায়। ‘গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা’ মূলত হয় বিভিন্ন দেশে ‘তালেবান’ তৈরির মাধ্যমে। এমনকি গুজব আছে ‘নাইন-ইলেভেনের’ ঘটনা আমেরিকার নিজেরই কাজ, শুধুমাত্র অন্য দেশের উপ হামলা চালানোর অজুহাত হিসেবে। তবে আজকের যুগে একমাত্র আমেরিকাকেই ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা’ করতে দেখা গেলেও সম্ভবত বিশ্বরাজনীতিতে তারাই এই কৌশলটির প্রথম ব্যবহারকারী নয়। ১৯৩১ সালে ‘মাঞ্চুরিয়ান ইন্সিডেন্ট’-এ জাপানের সেনাবাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন মাঞ্চুরিয়া অঞ্চলের রেললাইনে, যেটির আরেকটি অংশ ছিল চীনে, অল্প পরিমাণে ডাইনামাইট বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে তেমন কোন ক্ষতিই হয় নি, তবে সেনাবাহিনী চীনকে দায়ী ঘোষণা করে তৎক্ষণাৎ সম্পূর্ণ সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে মাঞ্চুরিয়া অঞ্চলের বাকি অংশ চীনের কাছ থেকে দখল করে নেয়।

গুজব রয়েছে, তালেবান যেভাবে সৃষ্টি করেছে আমেরিকা, ঠিক একইভাবে আইএস-ও তাদের সৃষ্টি। যে কারণে অনেকে আশঙ্কা করছেন, রোহিঙ্গা সমস্যাও তাদেরই সৃষ্টি। অবশ্য এ সন্দেহের কারণও আছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করা এক মানবাধিকার কর্মীর কাছে থেকে জানা যায়, রোহিঙ্গারা কয়েকটা দাবী পেশ করেছে, যার মাঝে অন্যতম হল ‘সম্পূর্ণ আইনী ভাষায়’ জাতিসংঘের সৈন্যদলের উপস্থিতির দাবী। প্রশ্ন হচ্ছে, একদমই নিরক্ষর রোহিঙ্গারা জাতিসংঘকে আনার চিন্তা পেল কোথা থেকে আর আইনী ভাষা শিখল কোথা থেকে। তবে এটি কিভাবে আমেরিকার কারসাজি সেটি বুঝতে হলে আরও কিছু তথ্য জানতে হবে। ‘রাশিয়া ব্লক’ নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরে সেন্টমার্টিনে নৌঘাঁটি করতে চাচ্ছে, কিন্তু তাদের অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। জাতিসংঘের সৈন্যদল আসা মানে মূলত আমেরিকার সেনা আসা। মূলত রোহিঙ্গা সমস্যা একটা ত্রিপাক্ষিক কৃত্রিম সমস্যা, মায়ানমার যার প্রয়োগকারী মাত্র। কারণ মায়ানমারে মোট পাঁচ ভিন্ন নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মুসলমান রয়েছে, তাদের প্রতি কোন অত্যাচার চালানো হয় নি, শুধু রোহিঙ্গারাই কেন? এর অন্যতম কারণ রোহিঙ্গাদের সাথে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষদের ভাষা খুবই ভালোভাবে মিলে যায়, চেহারাতো বটেই। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা কর্তৃক বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা, এমনকি পুলিশের গায়ে হাত তোলার মত ঘটনাও ঘটেছে। ধারণা করা হয় আমেরিকা, চীন, ও মধ্যপ্রাচ্যের – এই তিনপক্ষের যোগসাজশে এই পরিকল্পনা করা হয়। রোহিঙ্গাদের জামাতে ইসলামীর সাথে সংশ্লিষ্টতার খবর মাঝে মধ্যেই পাওয়া যায়। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সাথে এদেশের এই সংগঠনটির যোগসূত্রের একটি কারণ বলা যেতে পারে, ধর্মভিত্তিক এই সংগঠনটির তৃণমূল কর্মী যত বাড়বে, তত সংগঠনটির লাভ। আবার ধর্মীয় কারণে বিতাড়িত মানুষদের সহানুভূতি আদায় সেই ধর্মের সংগঠনগুলোর জন্য সোজা। সমস্যা হচ্ছে এর মাধ্যমে তাদের ভেতর প্রবেশ করছে অমুসলিম বিদ্বেষ। সুতরাং এই বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গা শরণার্থী যে বাংলাদেশ থেকে অমুসলিম বিতাড়নে সহায়তা করবে, একটা উল্লেখযোগ্য শক্তি হবে, তা বলাই বাহুল্য।

এ পর্যায়ে এসে যাদের অস্বস্তি হচ্ছে, তাদের জানাই, প্রতিবছর দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে কোন না কোনভাবে একাধিক হিন্দু পরিবারকে ধর্মীয় হয়রানি-নির্যাতনের মাধ্যমে দেশত্যাগ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এভাবে আস্তে আস্তে প্রত্যন্ত অঞ্চলের হিন্দুদের যখন সম্পূর্ণ রূপে বিতাড়ন করা হবে, তখন শহরের হিন্দুদেরও শক্তি থাকবে না নির্যাতনের প্রতিবাদ করার। কারণ একজন মানুষের জোর মূল তার ‘ভিটেমাটি’। সেই জায়গাটা নষ্ট হয়ে গেলে সে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ে। যাই হোক, এদেশ থেকে ধর্মীয় সংখ্যালঘু বিতাড়ন সম্ভব হলে মধ্যপ্রাচ্যের যা লাভ, তা হলো নিজেদের পক্ষে আরেকটি সম্পূর্ণ বা প্রায় সম্পূর্ণ ইসলামিক রাষ্ট্র যুক্ত হওয়া। কিন্তু আসল লাভ আমেরিকা ও চীনের। কারণ একটি পরিপূর্ণ ইসলামী রাষ্ট্রে আমেরিকার তালেবান গোষ্ঠী তৈরী করতে খুব সুবিধা, আর তালেবান ধাঁচের কোন গোষ্ঠী তৈরী হয়ে গেলে আমেরিকার ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা’ করতে আসাটা ‘কর্তব্যের মাঝে পড়ে’। তবে এখানে বাংলাদেশ মূল লক্ষ্য নয়। আমেরিকার মূল লক্ষ্য রাশিয়া, চীনের মূল লক্ষ্য ভারত।

আমেরিকা এদেশে তালেবান ধাঁচের গোষ্ঠী তৈরী করতে সক্ষম হলে তাদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নের নৌঘাঁটিটি স্থাপন করা যাবে। শুধু তাই না, বাংলাদেশে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন সরকার থাকলে রাশিয়া ব্লকে একটা ছেদ তৈরী করা যাবে। আর চীনের লাভ হল তাদের সবদিক থেকে নিকটবর্তী প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে দুর্বল করার সমূহ সম্ভাবনা তৈরী হবে। হিন্দু-বিদ্বেষের মাধ্যমে পাকিস্তান এমনিতেই ব্যস্ত রেখেছে ভারতকে। চীনও মাঝে মাঝে তার উপস্থিতি জানান দেয় দেশটিকে। দুই বিপরীত ফ্রণ্টে বিপক্ষ সেনাবাহিনী সামলাতে ভারত ভালোই ব্যস্ত। এর মাঝে আরেকটি ফ্রণ্টে সেনা তৎপরতা সামাল দিতে হলে, বিষয়টা একদমই সহজ হবে না ভারতের জন্য। এবং সীমান্তে অস্থিরতা বৃদ্ধি পেলে রাজ্যসমূহ আলাদা হয়ে যাবার জন্য স্বাভাবিকভাবেই নিজস্ব তৎপরতা শুরু করবে। এই রাজনৈতিক চালে মাঝখান থেকে একেবারেই করুণ অবস্থায় পতিত হবে যেই রাষ্ট্রটি সেটি হল বাংলাদেশ।

ঠিক একইভাবে আজকের রাষ্ট্রীয় রাজনীতির বলি হবে গণবিশ্ববিদ্যালয়গুলো। আমরা জানি গণবিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত। রাষ্ট্রপতিকে আচার্য করার মাধ্যমে সরকার ও গণবিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে যোগসূত্র তৈরী করা হলেও, বিশ্ববিদ্যালয় কিভাবে চলবে সেটি সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। যদিও শাবিপ্রবিতে গোল চত্বরে ভাস্কর্য তৈরীর ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দলের নেতার হস্তক্ষেপ দেখা গিয়েছে। এখন যতদূর মনে পড়ছে ‘সচেতন সিলেটবাসী’ মিছিল করার পর শিক্ষামন্ত্রীর হস্তক্ষেপে ভাস্কর্য নির্মাণ স্থগিত হয়ে যায়। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ছাত্র রাজনীতির সংঘর্ষগুলোও মূল সংগঠনের বিভিন্ন নেতাদের সংশ্লিষ্টতা থাকে। যদিও বছরজুড়ে ছাত্ররাজনীতিতে বিভিন্ন প্যানেলের শিক্ষকদের সংশ্লিষ্টতাই বেশি। একবার একজন ছাত্রলীগ কর্মী আমাকে বলেছিলেন, ‘শিক্ষকদের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া কোন শিক্ষাঙ্গনে কোনদিন ছাত্র রাজনীতি থাকতে পারে না।’

শিক্ষাঙ্গনে এখন উপাচার্যে বাংলোর চতুর্পাশে থাকে বিদ্যুতায়িত তার, শিক্ষাঙ্গনে আছে সিসিটিভি ক্যামেরা, পুলিশ ফাঁড়ি। সেই সিসিটিভি ক্যামেরা আবার উপচার্যের প্রয়োজনে বন্ধ করে দেয়া হয় যেন ঠিক কারা শিক্ষকদের গায়ে হাত তুলেছে সেটার প্রমাণ পাওয়া না যায়, যদিও হামলার সময় প্রক্টোরীয় পরিষদের অনেক শিক্ষক ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকেন। সেই পুলিশ ফাঁড়ির অদূরে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলের ফান্ড থেকে দুই লক্ষ টাকা চুরি যায়। সেই পুলিশ সদস্যরা শিক্ষার্থীদের কর্তৃত্বের সাথে জিজ্ঞেস করেন, ‘এত রাতে শিক্ষাঙ্গনে কী কর? এখন যদি কোন বিপদ ঘটে তবে নিরাপত্তা কে দেবে?’

সরকার যেন এখানে আমেরিকা, আর উপাচার্যরা একেকটি নিয়ন্ত্রিত সরকার, শিক্ষাঙ্গন-পুলিশ জাতিসংঘের নামধারী আমেরিকার সেনা। শাবিপ্রবির কথাই যদি ধরা হয়, তবে যখন ছিনতাই বেড়ে গেল, তখন শাবিপ্রবির সীমানা প্রাচীরের বিষয়টি সুরাহা না করে তড়িঘড়ি করে অস্থায়ী পুলিশ-ফাঁড়ি নির্মাণ ও স্থায়ী পুলিশ-ফাঁড়ির নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া কতটুকু যুক্তিসঙ্গত সেটি বোধগম্য না। এই বিষয়টি স্পষ্ট হয় একটি পুলিশ সদস্যের ‘যদি কোন বিপদ ঘটে তবে নিরাপত্তা কে দেবে’ উক্তির মাধ্যমে। এছাড়াও, উপাচার্যকে যেদিন ২৪ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়, সেদিন রাতের বেলা পুলিশেরা যেসব শিক্ষার্থী সে আন্দোলনে যোগ দিতে আসছিল, তাদেরকে মৌখিক ভয়ভীতি দেখিয়ে আবার বাসায়/মেসে ফেরত পাঠাতে চাইছিল বলে জানা যায়। রাতের বেলা পুলিশেরা অ্যাকশনে যেতে উদ্যত হলে হঠাৎ আন্দোলনকারীদের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হলে পুলিশ নিবৃত্ত হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে প্রক্টর থাকা সত্ত্বেও, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ আন্দোলন হওয়া সত্ত্বেও, আন্দোলনটি নিরস্ত্র হওয়া সত্ত্বেও পুলিশ কেন আসে যদি না ‘বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের’ নাম করে বাধ্যতা সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণের ব্যাপার না থাকে?

পত্র-পত্রিকায় দেখা যায় বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা কর্মীদের খুঁজে খুঁজে পেটাচ্ছে ছাত্রলীগ, শিক্ষকদের উপর গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধা করছে না। একজন শিক্ষার্থীর হাড্ডি ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। মেয়েদেরকে ধর্ষণের হুমকি দেয়া হচ্ছে। সবাই জানে এটা কারা করছে, তবুও ক্ষমতাসীন দল বলছে ‘কতিপয় সন্ত্রাসী’ করছে। মূল সংগঠনের নেতাদের কি শাখা সংগঠনের নেতা-কর্মীদের উপর একটুও নিয়ন্ত্রণ নেই? এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? তবে মূল সংগঠন এটির অনুমতি দিচ্ছে মানে নিশ্চয়ই তাদের লাভ আছে। আর ক্ষমতাসীন দলের মূল লাভ হল নিয়ন্ত্রণ। গণবিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা হলেন বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর। ডিসেম্বর ১৪ একই কারণে ঘটেছিল; প্রতিটি সরকারই চায় বুদ্ধিজীবীদের নিয়ন্ত্রণ করতে।

কাজেই সামনের নির্বাচনে যখন আবার আওয়ামী লীগ আসবে, সবাই বুঝতে পারছে দৈব দুর্ঘটনা না ঘটলে আওয়ামী লীগই আবার আসবে, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়তো শিক্ষাঙ্গন-থানা দেখতে পাব আমরা। জাতিসংঘের নামধারী আমেরিকার সেনারা দেখবে যেন কোন কিছু আমেরিকার নীতির বিরুদ্ধে না যায়। আমেরিকার নিয়ন্ত্রণাধীন সরকার যা খুশি তাই করার লাইসেন্স পাবে, বিনিময়ে পুতুল রাষ্ট্রের বুদ্ধিজীবীদের নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রতিশ্রুতি দেবে। আর এ সবই ঘটবে মাঞ্চুরিয়ান ইন্সিডেন্টের মাধ্যমে, ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা’ করার ‘অপরিসীম তাগিদ’ থেকে। ফেইসবুক মারফত জানা যায় কোটা সংস্কারের পক্ষের একজন কর্মী ছাত্রলীগের হাতে প্রহৃত হয়ে রক্তাক্ত হলে সে প্রক্টরকে ফোন দিলে তাঁর প্রথম বক্তব্য ছিল, ‘তুমি এত রাতে সেখানে কী করছিলে?’ সুতরাং যখন ক্যাম্পাসে নিয়ন্ত্রণ নেয়া হবে সরকারের পক্ষ থেকে, তখন হয়তো বলা হবে, ‘আন্দোলনের সময় কিছু সন্ত্রাসী কী করেছিলো তো দেখেছই। কাজেই পুলিশ, সিসিটিভি এসব তো তোমাদের নিরাপত্তার জন্যই।’

বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ে দরকার না হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন কেন দরকার সেটা এ পর্যায়ে বলা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আগের স্তর পর্যন্ত গৎবাঁধা কিছু বিষয় শেখানো হয় মাত্র, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে হয় জ্ঞানের চর্চা, অন্ততে কাগজে-কলমে তা-ই বলে। সেই জ্ঞানের চর্চার ফলে মহাবিদ্যালয় পর্যন্ত যা শেখানো হয়েছে তাকে ভুল বলার মতও পরিস্থিতি তৈরী হতে পারে। চিন্তার জগতের স্বাধীনতার ফলেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বুদ্ধিজীবীদের সূতিকাঘর। আর এই জ্ঞান চর্চার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে এমন সিদ্ধান্তও আসতে পারে যেগুলো হয়তো সরকারের বিপক্ষে, কিন্তু দেশের পক্ষে। বলে রাখা ভাল, সরকারের উন্নতির পক্ষে কাজ করা আর দেশের উন্নতির পক্ষে কাজ করা সম্পূর্ণ আলাদা দুইটি বিষয়। দুইটি তার একই সুরে বাজতেই পারে, তবে তাতে তারদ্বয় একটি তারে পরিণত হয় না, পৃথক দুইটি তারই থেকে যায়। এই কারণেই সকল সরকার চায় বুদ্ধিজীবীদের উপর নিয়ন্ত্রণ।

কাজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন জরুরী। আর এর রক্ষক হতে পারে মূলত শিক্ষার্থীরাই। অন্যতম কারণ সংখ্যাধিক্য হলেও, আরেকটি কারণ হল তাদের ভোগবিলাসের ক্ষেত্র তৈরী না হওয়ায় তাদের কিনে নেয়া সহজ হয় না অধিকাংশ ক্ষেত্রে। শিক্ষকদের ক্ষেত্রে উপাচার্য হবার প্রস্তাব, গবেষণার ফান্ড, সন্তানের সুভবিষ্যৎ, ব্যাঙ্কব্যালেন্স বৃদ্ধি, সরকারী সুবিধাসহ নানা সুবিধা দিয়ে তাঁদের কিনে নেবার সম্ভাবনা থেকে যায়, জোর দিয়ে বলা যায় না যে সম্ভব হয়, তবে সেই ক্ষেত্রটা থেকে যায়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের এসব ক্ষেত্রসমূহই নেই। অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে আর্থিকভাবে লাভবান করে দেয়া, সংগঠনকে আর্থিকসহ প্রশাসনিক সুবিধা দেয়া ইত্যাদি স্বল্প কিছু ক্ষেত্র থেকে যায় একজন শিক্ষার্থীকে কিনে নেবার।

শাবিপ্রবির ক্ষেত্রে হয়তো কোটা সংস্কার আন্দোলন বিষয়ক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না যেখানে খোদ বর্তমান উপাচার্যই সমর্থন দিয়েছেন। তবে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মত এখানেও স্বায়ত্তশাসন সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাবার ভয় একদমই উড়িয়ে দেয়া যায় না। আর তার জন্য কোন রাজনৈতিক দল বা সাংস্কৃতিক জোট কখন এসে একত্রিত করে দিয়ে যাবে সে আশায় বসে না থেকে, স্বায়ত্তশাসনের চিন্তা থেকে একত্রিত থাকা উত্তম ও যৌক্তিক। কারণ ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলবে সেটি ভাবাটাই নির্বুদ্ধিতা। বিরোধী দলের ছাত্রসংগঠন সাধারণত শিক্ষাঙ্গনে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না, তাদেরকে দমিয়ে রাখা হয় পেশীর জোরে। আবার করলেও সেটিকে ক্ষমতাসীন পক্ষ ‘গণ্ডগোল বাঁধাবার চেষ্টা’ হিসেবে প্রচার করবে, যা অনেক ক্ষেত্রে খুব একটা মিথ্যাও না। বামপন্থী ছাত্র সংগঠন প্রতিবছর বছরব্যাপী অনেক কার্যক্রম দেখায়, কিন্তু আদতে এগুলো কোনটা ফলপ্রসূ হয়েছে বলে মনে পড়ে না। বাকি থাকে সাংস্কৃতিক জোট। সম্পূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্মৃতিতে যতটুকু মনে পড়ে, এই সম্মিলিত শক্তির রাজনৈতিক সচেতনতা অত্যন্ত রহস্যময়। কখনও এটি শিক্ষকদের বাধ্য – শিক্ষার্থীদের প্রতি নেতিবাচক ইস্যুতে আশ্বাস প্রদান পূর্বক আন্দোলন স্থগিত করতে বললে আন্দোলন স্থগিত হয়ে যায়, এমনকি আন্দোলন শুরুর আগেই উদ্যোগ থেমে যায় অনেক সময়। আবার কখনও বা উদ্দাম তারুণ্যের প্রবল জোয়ারে তছনছ হয়ে যায় সব কিছু, খালি কথায় তখন চিড়া ভিজে না। সাধারণত যেকোন আন্দোলন, মানববন্ধন ইত্যাদি আচরণ রাজনৈতিক আচরণের মাঝে পড়ে। দেখা গিয়েছে, সব সময় না হলেও, সাধারণত সাংস্কৃতিক জোটের যেকোন রাজনৈতিক আচরণ ঘটে সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানারে, আবার মহৎ কোন কাজ বা সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী সাধারণত ঘটে সাংস্কৃতিক জোটের ব্যানারে। একবার একজন সংবাদকর্মী ছাত্রলীগের কোন এক নেতার কুকীর্তির কথা প্রকাশ করে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়েছিলেন। সেসময়ে আরও অনেককে লাঞ্ছিত করা হয়েছিল ছাত্রলীগের নেতিবাচক দিক অনলাইনে তুলে ধরার জন্য। তিনি পরবর্তীতে ছাত্রলীগের অনৈতিক আচরণের প্রতিবাদস্বরূপ একটি মানববন্ধনের জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের আশার প্রদীপ সাংস্কৃতিক জোটের শরণাপন্ন হলে তাকে জানানো হয়েছিল কোন রকম মানববন্ধন আয়োজন করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়, তবে কোন ধরণের মানববন্ধন হলে বিবেকবান শিক্ষার্থী হিসেবে তারা (তৎকালীন সমন্বয়ক ও তাদের কাছের জনেরা) থাকবেন। আবার, পরবর্তীতে সাংস্কৃতিক জোটের পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধিদল উপাচার্যের সাথে দেখা করতে গেলে তাদের সাথে রূঢ় আচরণ করা হলে তৎক্ষণাৎ দুর্বার আন্দোলনের ডাক দেয়া হয়েছিল। কাজেই সম্মিলিত এই শক্তিটির নীতি ঠিক কখন কীরকম থাকবে সেটি আঁচ করা মুশকিল। রাজনৈতিক বিভিন্ন সংগঠন ও সাংস্কৃতিক জোটের কার্যক্রম এখন বদলেছে কিনা জানা নেই। মোট কথা, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন হুমকির মুখে পড়লে কখন একটি অধিকার আদায়ের মঞ্চ তৈরী হবে তার আশায় বসে থাকার চেয়ে ব্যক্তিগত সচেতনতা অনেক বেশি প্রয়োজনীয়। সর্বোপরি, কোন নির্দিষ্ট প্রতীকের প্রতি আনুগত্যের থেকে কোন নির্দিষ্ট চেতনার প্রতি আনুগত্য সবসময়ই অধিকতর কার্যকরী।

লেখক পরিচিতি: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

লেখাটি খোলা কলম বিভাগে প্রকাশিত। খোলা কলম বিভাগে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার সকল দায়ভার একমাত্র লেখকের। এ বিভাগে প্রকাশিত লেখাসমূহে সাস্টনিউজ টোয়েণ্টিফোর ডট কমের সংবাদ পরিচালনা নীতির প্রতিফলন থাকতেও পারে, নাও পারে। ন্যূনতম ৩০০ শব্দে খোলা কলম বিভাগে প্রকাশের জন্য আপনিও লেখা পাঠাতে পারেন sustnews24@gmail.com ঠিকানায়।

Share via email

ক্যাটাগরি অনুযায়ী সংবাদ

এই সংবাদটি ১৯ জুলাই ২০১৮ইং, বৃহস্পতিবার ১৮টা ৩০মিনিটে অতিথি লেখক, খোলা কলম, সর্বশেষ ক্যাটাগরিতে প্রকাশিত হয়। এই সংবাদের মন্তব্যগুলি স্বয়ঙ্ক্রিয় ভাবে পেতে সাবস্ক্রাইব(RSS) করুন। আপনি নিজে মন্তব্য করতে চাইলে নিচের বক্সে লিখে প্রকাশ করুন।

১ Comment for “রাজনীতির বলির পাঁঠা”

  1. সাঈদ

    ইহা কি খোলা কলাম নাকি উপন্যাস? :p
    পড়তে ধরে শেষ করার সময় হবে না জন্য ছেড়ে দিলাম। একটু পর পড়তে বসবো আবার। ইন্টারেস্টিং টপিক… @কর্ণ দা

Leave a Reply

300 x 250 ad code innerpage

Recent Entries

120 x 200 [Sitewide - Site Festoon]
প্রধান সম্পাদক: সৈয়দ মুক্তাদির আল সিয়াম, বার্তা সম্পাদক: আকিব হাসান মুন

প্রকাশিত সকল সংবাদের দায়ভার প্রধান সম্পাদকের। Copyright © 2013-2017, SUSTnews24.com | Hosting sponsored by KDevs.com