360 x 130 ad code [Sitewide - Site Header]

একটুখানি জাফর ইকবাল

Share via email

ভোপেনের দিনলিপি
ছোটবেলা কখন কিভাবে গল্প পড়ার শুরু মনে নেই। এটুকু মনে আছে, ক্লাস সিক্সে পড়াকালীন স্থানীয় পাঠাগারে যাতায়াত করতাম। গোপাল ভাঁড় আর টুকটাক ভূত প্রেত রূপকথা। মাঝে মাঝে ওখান থেকে বের হয়ে বইয়ের দোকানে যেতাম। পাঁচ টাকা দিয়ে কিছু বই পাওয়া যেত। আমার আনন্দ আর ধরে না। এক রাতেই শেষ দিলে বইটার সম্পূর্ণ স্বাদ পাওয়া যাবে না- এই ভেবে ঘুমুতে যাওয়ার আগে পাঁচ রাতে পাঁচটা গল্প শেষ হত।

বই পড়াটাকে শৌখিনতা মনে হত। জ্ঞানের জন্য বই পড়া দরকার- এই ব্যাপারটা কখনো মাথায় কাজ করত না। কেউ যদি জিজ্ঞেস করত ‘তোমার প্রিয় শখ কী’, উত্তর দিতাম বই পড়া। শখের বশে, আনন্দ লাভ ছাড়া আর বেশি কিছু কি পাবার আছে সেটা থেকে?

গোপাল ভাঁড় আর পাঁচ টাকার বইয়ের বাইরেও যে আনন্দ লাভের জন্য আরো কিছু পাঠ্য উপকরণ আছে সেটা জানিয়েছিল আমার বন্ধু রাশেদ। ওর হাত ধরেই তিন গোয়েন্দা আর মাসুদ রানার সাথে পরিচয়। গল্পের বই পড়ার লেভেল পরিবর্তন হয়েছে। বেশ ফুরফুরা অনুভব করতাম। মনে হত, আমিই সবচেয়ে চালাক। সবচেয়ে ভাল বইগুলি এখন আমি পড়ি। শিশুতোষ হিসেবে জাফর ইকবালের সাথে তখনো পরিচয় হয় নি।

বই পড়াটাকে সবসময় অভিজাত আনন্দ লাভের শখ ছাড়া আর কিছুই মনে হত না। বন্ধু বিভাষ কবে থেকে বই পড়া শুরু করে- জানা নেই। তবে জাফর ইকবালকে ওর থেকেই চেনা। সুন্দর মলাটের দামি বই। বিভাষ অভিজাত স্টুডেন্ট। ওর পাশ ঘেঁষে কাজ নেই। বাল্যকালে তাই জাফর ইকবাল আমার অস্পর্শই থেকে গেল। অথচ আমাদের জেনারেশন জাফর ইকবালকে লালন করেই নাকি বেড়ে উঠেছে। পরবর্তীতে ছোটদেরকে উনার বই পড়তে উৎসাহিত করলেও আমার আর পড়া হয়ে উঠে নি। ততদিনে যে বড় হয়ে উঠেছি!

আজ পর্যন্ত খুব অল্প কয়টা বই’ই উনার পড়া হয়েছে। ২০১৪ কি ২০১৩ সালের ঘটনা। ভার্সিটির অভ্যন্তরীণ ঘটনার জের ধরে উনি পদত্যাগ করেন। শীতের রাতে দল বেঁধে সব ভিসির বাসা অবরোধ করেছিল – স্যারকে ফিরিয়ে আনতে। আমিও গিয়েছিলাম। আমার প্রিয় লেখক বলে নয়। যাঁর বই পড়লাম না সে কি করে প্রিয় লেখক হয়? তবে প্রিয় মানুষ বটে।

জীবনে অনেক বড় আফসোস – উনার ক্লাস করা হল না। সিলেট থেকে ঢাকা কি হবিগঞ্জ গেলেই আশেপাশের মানুষের এক জিজ্ঞাসা – জাফর ইকবাল তোমাদের ক্লাস নেয়? আমি তাদের আশাহত করি। জাফর ইকবাল স্যারের পাশ দিয়ে হাঁটি, উনার রুমের আশেপাশে আমাদের অবাধ যাতায়াত; চাইলেই ছবি তোলা যায় কিন্তু তুলি না – এসব গল্প করি।

বৈশাখের প্রথম দিন ছবি তোলার জন্য ক্যাম্পাসে উনাকে আমি সহজলভ্য হয়ে যেতে দেখেছি। সবাই দলে দলে উনার সাথে ছবি তোলে ফেবুতে আপলোড দিয়ে আপ্লুত হয়। আমি এসব দেখে মুচকি হাসি।

উনার প্রতি আলাদা টান অনুভবের কোন কারণ ছিল না। আমি উনার বই পড়ি নি। ঠাকুরমার ঝুলি গোপাল ভাঁড় আর ভূত প্রেতে বিশ্বাসী আমি, উনি বিজ্ঞান লেখক কল্প লেখক। উনার পাশে আমি বেমানান।

তারপরও উনার জনপ্রিয়তা সবসময় আকর্ষণ করে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা হাসিখুশি সুন্দর কথার এই মানুষকে ভাল না বেসে উপায় নেই। সমুদ্র সমান জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও উনি নিজেকে বারবার বিভক্ত করেছেন নানা ইস্যুতে; রাজনৈতিক কি অরাজনৈতিক। উনাকে এক পলক দেখতে পেয়ে কেঁদে ফেলা ছেলেটাও উনার নিন্দায় মুখর হয়েছে। উনি সর্বশেষ বিভক্ত হয়েছেন সাম্প্রতিক সাস্ট র‍্যাগ ঘটনায়।

প্রশাসন যখন র‍্যাগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে দোষীদের উপর বহিষ্কারাদেশ আরোপ করে, সাধারণ ছাত্রের ব্যানারে শুরু হয় অবরোধ কর্মসূচী। স্যার জানান, তিনি লজ্জিত। আন্দোলনকারীরা উনার ছাত্র-ছাত্রী, এই ভেবে উনি লজ্জিত। এতে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখায় কেউ কেউ। বিভক্ত হয় প্রিয় শিক্ষকের ভাবমূর্তি। এমনই বিতর্কিত পরিস্থিতিতে স্যারের উপর হয়ে যায় হামলা; উদ্দেশ্য – শারীরিকভাবেই বিভক্ত করে দেয়া।

প্রথমে যখন জানতে পারি ধরে নেই এই কাজ নিশ্চিত বহিষ্কৃত ছাত্রদের কাজ। মাথা কাজ করছিল না। ফেইসবুকের নিউজফিড স্ক্রল করতে করতে কিছুটা ধাতস্ত হলাম। হুমায়ূন আহমেদ যখন চিকিৎসার জন্য চলে গেলেন শেষমমেশ তখন তেমন কিছু মনে হয় নি। এ আর এমন কী? বড় মানুষ এত তাড়াতাড়ি কি আর চলে যেতে পারে? মানুষই বাঁচিয়ে রাখবে। আজকেও (গতকাল) তেমনই স্বাভাবিক লেগেছিল। সুন্দরবন নিয়ে স্যার লাইনে দাঁড়ান নি বলে যে লোক স্যারের নিন্দা করলেন তিনিই আজ ব্যাকুল, উদ্বিগ্ন, উত্তেজিত। এ যেন প্রথম প্রেমিক। বারবার ব্যাথা দিলেও কাছেই টেনে নেয়া যায় শুধু। পৃথিবীর বিভিন্ন কোণ থেকে সবাই উদ্বেগ প্রকাশ করছে। উদ্বিগ্ন তো হবেই। ভালো তো বাসবেই। ভালো তো এমন একজন মানুষকেই বাসা যায় যিনি সম্ভাব্য আততায়ী তাঁর ছাত্র কি না খোঁজ করেন, অপারশনের টেবিলে শুয়ে তাকে আঘাত না করার নির্দেশ দেন। এরকম চিন্তাধারার ব্যক্তিকে তো মানুষ ভালবাসবেই। মুক্ত চিন্তা যেখানে হাতড়ে বেড়াচ্ছে পথ, প্রদীপের শেষ সলতেটুকুই তো সম্বল; সেটাকে এত জলদি নিভতে দেয়া যাবে না।

ভোপেনের দিনলিপির অন্য লেখা:

[খোলা কলম বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার একমাত্র লেখকের, এর সাথে সাস্টনিউজ টোয়েণ্টি ফোর ডট কমের দৃষ্টিভঙ্গির মিল থাকতেও পারে নাও পারে। খোলা কলম বিভাগে লেখা প্রকাশ করতে চাইলে ন্যূনতম ৩০০ শব্দে আপনার লেখা পাঠাতে পারেন sustnews24@gmail.com ঠিকানায়।]

Share via email

ক্যাটাগরি অনুযায়ী সংবাদ

এই সংবাদটি ৫ মার্চ ২০১৮ইং, সোমবার ১০টা ৪৬মিনিটে অতিথি লেখক, খোলা কলম, সর্বশেষ ক্যাটাগরিতে প্রকাশিত হয়। এই সংবাদের মন্তব্যগুলি স্বয়ঙ্ক্রিয় ভাবে পেতে সাবস্ক্রাইব(RSS) করুন। আপনি নিজে মন্তব্য করতে চাইলে নিচের বক্সে লিখে প্রকাশ করুন।

Leave a Reply

300 x 250 ad code innerpage

Recent Entries

120 x 200 [Sitewide - Site Festoon]
প্রধান সম্পাদক: সৈয়দ মুক্তাদির আল সিয়াম, বার্তা সম্পাদক: আকিব হাসান মুন

প্রকাশিত সকল সংবাদের দায়ভার প্রধান সম্পাদকের। Copyright © 2013-2017, SUSTnews24.com | Hosting sponsored by KDevs.com