360 x 130 ad code [Sitewide - Site Header]

৩২০ একর এবং অদ্ভুত আখনিখোরদের কষ্ট

Share via email

খোলা কলম:

আপনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মত স্বনামধন্য এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ৩২০ একরের মুটামুটি বড় একটা ক্যাম্পাস সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের।

সকালের নাস্তা করবেন। কত টং দোকান, ক্যাফেটেরিয়া, হলের ডাইনিং, ক্যান্টিন। ভাবলেন দুটো রুটি আর ডিম দিয়ে নাস্তা সারবেন। সারা বিশ্ববিদ্যালয় চষে ফেললেন, কিন্তু কোথাও আপনাকে কেউ একটা রুটি দিতে পারলো না। টং গুলোতে মিলল তেলে ভাজা সিঙ্গারা, আলুর চপ, পিঁয়াজু বেগুনী, তেলচুপচুপে মাংস ছাড়া (!) অদ্ভুত বিস্বাদ আখনী! তবে হ্যাঁ, ক্যাফেটেরিয়ায় তেল চুপচুপে পরোটা পাওয়া গেল। তেল ছাড়া দিতে বলার পরও যেটাকে টিস্যু দিয়ে ২ বার মুছে কোনমতে মুখে পুরলেন। কারণ কিছুই করার নাই, ক্লাস শুরু হলো বলে।

সকালে এতগুলো তেল খেয়ে এমনিতেই অস্বস্তি লাগছিল। গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা যাদের আছে তারা কি করে চলে সেটা ভাবতে লাগলেন। যাই হোক, এতগুলা ক্লাস করে এখন শান্তিমত দুপুরের খাবারটা খাবার নিমিত্তে টঙ্গে গেলেন। বাহ, দুপুরেও সেই একই জিনিস। তেলে ভাজা সিঙ্গারা, আলুর চপ, পিঁয়াজু বেগুনী, তেলচুপচুপে মাংস ছাড়া অদ্ভুত বিস্বাদ আখনী!

কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়ায় গিয়ে বসলেন। সবগুলা আইটেমে তেল ভাসছে নাকি তেলের মধ্যে আইটেম গুলা ভাসছে সেটা নিয়ে আপনি চিন্তায় পড়ে গেলেন। একই ভাবে মশলার মধ্যে খাবার নাকি খাবারের মধ্যে মশলা সেটা নিয়েও গবেষণা হওয়া দরকার বলে মনে করলেন। এক আইটেম খেয়ে আপনার মনে হলো “পৃথিবীতে লবণ বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব আছে এটা কি উনারা জানেন না?” আরেক আইটেম খেলে মনে হবে লবণটাই হয়ত আপনি চেয়েছিলেন সাথে একগাদা ঝাল-মশলা-তেল আর মাইক্রোস্কোপিক রুই মাছের টুকরাটা ফ্রি দিয়েছে। উনারা বড়ই উদার কি না! এগুলা বেশিদিন খেলে মুখের “রুচি” আত্মহত্যা করতে বাধ্য।

দামের ব্যাপারটা কিন্তু কোন ছাড় নাই। এই বিস্বাদ, অস্বাস্থ্যকর, মাইক্রোস্কোপিক সাইজের খাবারের দাম ভার্সিটির বাইরের খাবারের দোকান গুলোর চেয়ে বেশি।শুধু কচুর লতি দিয়ে ভাত খেলেও আপনাকে গুনতে হয় ৪০ টাকা। ডিম-ভাত ৩০/৩৫ টাকা। তেলে ভাসা ডাল নিলে অতিরিক্ত ৫ টাকা গুনতে হয়, এক্সট্রা ভাত নিলেও ৫ টাকা করে দেওয়া লাগে।

ক্যাম্পাসে যে মিথ্যা আখনি ২৫ টাকা দিয়ে খান তার চেয়ে ঢের ঢের ভাল মাংসসহ সত্যিকার আখনি (ছোলা, পিঁয়াজু তো আছেই) আপনি খেতে পারবেন এই আখালিয়া তথা ক্যাম্পাসের এলাকাটা পেরুলেই। পরিমাণেও থাকবে অনেক বেশি আর স্বাদ মুখে লেগে থাকার মত। বিশ্বাস না হলে হাওয়াপাড়া মসজিদের বিপরীতে খাবারের দোকানটাতে খেয়ে আসতে পারেন।

একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ার খাবারের দাম প্রশাসন থেকে নির্ধারণ করে দেওয়ার কথা। সেটা কি আদৌ দেওয়া হয়েছে? যদি দেওয়া হয়েই থাকে সেটা কি যারা ক্যাফেটেরিয়া চালাচ্ছেন তারা মানছেন? একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেরেরিয়ার খাবারের মান এমন হবার পরও তারা কীভাবে দিনের পর দিন ব্যবসা করে যাচ্ছেন?

একটু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ টানবো, নিচের লেখাটুকু ঢাকা টাইমস এ গতকাল (১৯ অক্টোবর) প্রকাশিত খবরের

 

একটি রুটি বা পরোটা তিন টাকা। ডাল ভূনা বা সবজি পাবেন পাঁচ টাকায়। ডিম ভাজি ১০ টাকা। ফুল প্লেট খিচুড়ি ১২ টাকা, হাফ প্লেট ছয় টাকা। এমন একটি করে মূল্যতালিকা চোখে পড়বে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হলের ক্যান্টিনগুলোতে গেলে। নতুন এই তালিকা অনুযায়ী হলের ক্যান্টিনগুলোতে সকাল, দুপুর ও রাতে নির্ধারিত ওই মূল্যেই বিভিন্ন খাবার পাওয়া যাবে।

এ ছাড়া সকাল ও রাতের খাবারে ফুল প্লেট ভাত ছয় টাকা, হাফ প্লেট ভাত তিন টাকা, মুরগির মাংস ২০ টাকা, ভাতসহ মুরগির মাংস ও ডাল ৩০ টাকা, গরুর মাংস ৩০ টাকা, ভাতসহ গরুর মাংস ও ডাল ৪০ টাকা, তেলাপিয়া, পাঙ্গাস, নলা, ছোট মাছ বা শুটকি মাছ ১৮ টাকা, ভাতসহ তেলাপিয়া, পাঙ্গাস, নলা, ছোট মাছ বা শুটকি মাছ ২৮ টাকা, রুই বা কাতলা মাছ ২২ টাকা ও ভাতসহ রুই বা কাতলা মাছ ও ডাল ৩২ টাকায় পাওয়া যাবে।

গত সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এক সভায় সব হলের জন্য নতুন এই মূল্যতালিকা সুপারিশ করা হয়। তবে কোনো হলে নতুন তালিকার চেয়ে কম মূল্যে খাবার পরিবেশন করা হলে তা অব্যাহত থাকবে বলে প্রকাশিত ওই প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়।

গত ১১ অক্টোবর ঢাবি উপাচার্যের সভাপতিত্বে প্রভোস্ট কমিটির সভায় সব হলের খাবারের মূল্য তালিকা এক করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মূল্য সমন্বয় করার দায়িত্ব দেয়া হয় প্রভোস্ট কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল ইসলামকে। পরে বিভিন্ন হলের ২১ জন আবাসিক শিক্ষক ও ১৫ জন ক্যান্টিন মালিকের উপস্থিতিতে এক সভায় তিনি নতুন এ তালিকা চূড়ান্ত করেন।

লক্ষ্য করুন, সেখানে আইটেমের ভ্যরিয়েশন অনেক বেশি, আর আপনি এখানে ওরা যা খাওয়াবে সেগুলা খেতেই বাধ্য। আবার দাম সেখানে সবকিছুরই অর্ধেকের কম। শাবিপ্রবি প্রশাসন এখানে চরমভাবে ব্যর্থ। তারা না নিশ্চিত করতে পারছে খাবারের মান কিংবা স্বাদ, না পারছে কম দামে খাবারের ব্যবস্থা করতে। এই ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারে না শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীরাও। এই খাদ্যের মান বা দামের ব্যাপারে এখনও পর্যন্ত কোন তুমুল আন্দোলন কিন্তু চোখে পড়েনি।

আচ্ছা, এবার আসেন, বাসি খাবার প্রসঙ্গে। সকাল বেলা যে বুরিন্দা/বুন্দিয়া(ছোট গোলগোল মিষ্টি) পাওয়া যায় সেটা কতদিন আগের বানানোর কোন ধারণা আছে? একদিন হঠাৎ দুর্গন্ধ পাওয়ায় সেখানে কর্মরত একজনকে জিজ্ঞেস করি “এটা কবে বানানো?” উনি মাথা নীচু করে ফেললেন। তার পরিচয় গোপন রাখার শর্তে জানালেন “অনেক সময় আগের দিনের গুলা বিক্রি হয় না, তখন নতুন গুলার সাথে আগের গুলাও যুক্ত করে দেওয়া হয়”। ক্যাশে বসা মোটা লোকটার কাছে জিজ্ঞেস করলে বললেন “মামা আজকে বানানো”। বললাম “গন্ধ কেন?” বললেন “কই গন্ধ?” ঝাড়ি দেওয়ার পর বললেন, “হয়ত বানানোর সময় কোন সমস্যা হয়ে থাকতে পারে”।

এক রাতে টঙ্গে পাওয়া জিলেপির রস

টংগুলোতে যেখানে খাবার রাখা হয় সেখানে কুকুর শুয়ে আছে এমন ছবি পোস্ট হয়েছে ফেসবুকে কিছুদিন আগে। খাবার রাখার জায়গাগুলোতে পোকামাকড় পড়ে থাকা নিত্যনৈমত্তিক। এক তেল অজস্রবার ব্যবহার করাটা চোখ সওয়া। সেই তেল খোলাভাবে সারারাত রেখে দিয়ে পরের দিন আবার সেই তেলে খাবার ভেজে খাওয়ানোর অভিযোগ আছে। একই ব্যাপার জিলেপির চিনির রসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ক্যাফেটেরিয়ায় বা টংগুলোতে যে টমেটোর সস নামক বস্তু খাওয়ানো হয় আমি নিশ্চিত সেখানে টমেটোর “ট” পাওয়ারও কোন সম্ভাবনা নেই। পুরোটাই ক্যামিকেল, আটা/ময়দা আর ক্ষতিকর রঙ।

এবার আসেন খাবার পানি প্রসঙ্গে। টং বলেন, ক্যাফেটেরিয়া বলেন এরা কোথাকার পানি খাওয়ায়? সরাসরি ই বিল্ডিং এর টয়লেট থেকে পানি আনে বেশিরভাগ টং। টয়লেটের ভেতরে অজু করার জন্য যে বসার জায়গা আছে সেখানে কোনদিন বসতে পারিনি। কারণ এই টঙ্গের পানি আনতে গিয়ে ঐ জায়গাটা ভিজিয়ে দিয়ে আসে টংওয়ালারা।

ক্যাফেটেরিয়ায় টয়লেটের পাশে যে বেসিন আছে (যেখানে সবাই হাত ধোয়) সেটার নীচ থেকে আনা হয় খাওয়ার পানি। ব্যাপারগুলা কতটা অস্বাস্থ্যকর এটা চিন্তা করতে চাই না, কারণ সেগুলা চিন্তা করলেও বমি চলে আসে। আর খেতে তো হবেই, তাই কিছুই করার নাই, আপনার হাত পা বাঁধা।

হলের খাবারের কথা বলবেন? দুইদিন পর পর দাম ঠিকই বাড়ানো হয় কিন্তু সেই একই তেল চুপচুপা মশলাওয়ালা তরকারীতে মাইক্রোস্কোপিক মুরগি কিংবা মাছের টুকরা। খাবারের স্বাদের কথা জিজ্ঞেস করলে “স্বাদ” নিজেই লজ্জা পাবে। আর পানির তো একই অবস্থা। ট্যাঙ্গের শরবত আর পানির রঙ প্রায় একই। যে তথাকথিত ফিল্টার বসানো আছে শাহপরাণ হলের সামনে সেটার ভেতরেই মশা মাছি পোকামাকড় বাসা বানিয়ে বসে আছে।

পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩২০ একর ঘুরেও আপনি সত্যিকার অর্থে স্বাস্থ্যকর কোন খাবার পাবেন না। “ইস্কনের” দীক্ষায় দীক্ষিত ভেজিটেবল টঙ্গেও ঐ একই তেলওয়ালা খাবার দাবার। এরা ভাতের ব্যবস্থা করে না, করে খিচুড়ি।

ভাবছেন, ক্যাম্পাসে যখন এতই সমস্যা, তাহলে বাইরে খাও। বাইরে ভার্সিটি গেটে যে খাবার দোকান গুলা আছে সেখানে টিকটিকির তরকারী মেলে। আর তেলাপোকা-ইঁদুরের বিষ্ঠা তো স্বাভাবিক ব্যাপার স্যাপার। নতুন একটা রেস্টুরেন্ট অবশ্য খুলেছে কিন্তু সেখানে যাওয়ার জন্য আগে পকেট ভারী করাটা আবশ্যকীয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন সেখানে যাওয়ার অবস্থা আছে বলে আমি মনে করি না। আর এত দামী খাবারের ভীড়ে, চির আকাঙ্ক্ষিত সাদা ভাত কিন্তু পাওয়া যায় না।

আমি নিশ্চিত শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের লিপিড প্রোফাইলিং করা হলে যে ফলাফল আসবে সেটা দেখলে আঁতকে উঠবে যে কেউ। একটা বড় সংখ্যক শিক্ষার্থীর যদি এই বয়সেই হার্টে ব্লক ধরা পরে আমি একটুও অবাক হবো না। শিক্ষার্থীদের স্থূলতা চোখে পড়ার মত আজকাল। আরও অন্যান্য রোগের কথা বাদই দিলাম এই অকাল স্থূলতা ডায়াবেটিকের সম্ভাবনাটাকেও বাড়িয়ে দিচ্ছে কয়েক গুণ।

মৌলিক চাহিদার মধ্যে সবার আগে কিন্তু খাদ্য। যেখানে স্বাস্থ্যকর খাদ্যই নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, সেখানে সুশিক্ষার নিশ্চয়তা কোথায়? ক্যাম্পাসের খাদ্য সমস্যার সমাধান করতে প্রশাসন, শিক্ষার্থী, ক্যাফেটেরিয়া, টং মালিক সকলেরই আলোচনায় বসা উচিৎ। আশাকরি খাদ্যসমস্যা নিরসনে কর্তৃপক্ষ শীঘ্রই কার্যকর পদক্ষেপ হাতে নিবে।

লেখক পরিচিতি: সৈয়দ মুক্তাদির আল সিয়াম, শিক্ষার্থীজেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ (২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষ), শাবিপ্রবি

সাস্টনিউজ টোয়েন্টি ফোর ডট কমের খোলা কলম বিভাগে প্রকাশিত সকল মতামত লেখকের নিজের। প্রকাশিত মতামতের জন্য সাস্টনিউজ টোয়েন্টি ফোর ডট কম কর্তৃপক্ষ কোনভাবেই দায়ী না।

Share via email

ক্যাটাগরি অনুযায়ী সংবাদ

এই সংবাদটি ২০ অক্টোবর ২০১৭ইং, শুক্রবার ১৬টা ৫৯মিনিটে খোলা কলম, মতামত, শিক্ষাঙ্গনে জীবনযাত্রা, সর্বশেষ ক্যাটাগরিতে প্রকাশিত হয়। এই সংবাদের মন্তব্যগুলি স্বয়ঙ্ক্রিয় ভাবে পেতে সাবস্ক্রাইব(RSS) করুন। আপনি নিজে মন্তব্য করতে চাইলে নিচের বক্সে লিখে প্রকাশ করুন।

মন্তব্যসমূহ

120 x 200 [Sitewide - Site Festoon]
প্রধান সম্পাদক: সৈয়দ মুক্তাদির আল সিয়াম, বার্তা সম্পাদক: আকিব হাসান মুন

প্রকাশিত সকল সংবাদের দায়ভার প্রধান সম্পাদকের। Copyright © 2013-2017, SUSTnews24.com | Hosting sponsored by KDevs.com