360 x 130 ad code [Sitewide - Site Header]

‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ’ ও শাবিপ্রবি ছাত্রলীগ

Share via email

সম্পাদকীয়

আজ শোকাবহ আগস্ট ১৫। ১৯৭৫ সালের এই দিন বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়।

বঙ্গবন্ধু নামটার সাথে দু’টি সংগঠনের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত; একটি হলো তাঁর প্রাণের সংগঠন আওয়ামী লীগ, আরেকটি হলো তাঁর রাজনৈতিক ব্যক্তিসত্তার উত্থানের সংগঠন ছাত্রলীগ।

বর্তমানে শাবিপ্রবি ছাত্রলীগসহ সারা দেশের ছাত্রলীগ যে কথাটি সবসময় বুক ফুলিয়ে উচ্চারণ করে, তা হলো তারা ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক।’ দুঃখজনকভাবে এই আদর্শ আসলে কোন আদর্শ, তা কোনভাবেই স্পষ্ট না। যদি মানুষের কৃতকর্মই তার অন্তরে লালন করা আদর্শের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে বলতে হয় শাবিপ্রবি ছাত্রলীগ ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ’ হিসেবে কিছু নেতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

বছরের শুরুতে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দুই দিনব্যাপী পথশিশুদের মাঝে খাবার বিতরণ করে ছাত্রলীগ, এ বছরে বলার মত এখন পর্যন্ত ছাত্রলীগের ভালো কাজ এটাই, যেটা তাও আবার একটা জনসেবামূলক সংগঠনের কাজ, ঠিক সরাসরি রাজনৈতিক কোন কাজ নয়। এছাড়া ছাত্রলীগের হাতে গোণা কয়েকজন নেতা জন্মদিনে পথশিশুদের খাওয়ান, বৃক্ষরোপণ করেন, কেউ হয়তোবা সচেতনতামূলক সংগঠনের সাথে জড়িত, তবে হাতেগোণা কয়েকজনের এমন ভালো কাজ নিজের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে বটে, তবে ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি বাড়াতে অতটা সহায়তা করে না, কারণ একটা সংগঠনের অধিকাংশ কর্মী যে আচরণ করে সেটাই সংগঠনের ভাবমূর্তি তৈরী করে। উল্লেখিত এই একটা সেবামূলক কাজের বিপরীতে ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে এখন পর্যন্ত ‘উপহার’ দিয়েছে অনেকগুলো সহিংস কর্মকাণ্ড। সাস্টনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কমে প্রকাশিত সংবাদের হিসেবে জানুয়ারী ৩১ তারিখে কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে অন্যের ঝগড়া নিজের কাঁধে নিয়ে, জুলাই ১৭ হলের আধিপত্যকে কেন্দ্র করে, জুলাই ২৩ একজন কর্মীর ধূমপানকে কেন্দ্র করে, আগস্ট ১ ও ২ শাবিপ্রবিতে নিজেদের আধিপত্যকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুইপক্ষে সংঘর্ষ হয়। ফেব্রুয়ারী ১৯ তারিখে এলাকাবাসীর সাথে শাবিপ্রবির ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের মাঝারী মাত্রার সংঘর্ষ বাঁধে, যদিও মূলত সেটি ছিল আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ছাত্রলীগের মধ্যকারই সংঘর্ষ, সেদিন এলাকাবাসীর হয়ে সংঘর্ষে জড়িত হয় মদনমোহন কলেজ শাখা ছাত্রলীগের একাংশ। যদিও পরবর্তীতে এতে স্থানীয় প্রভাবশালী বিএনপি’র একজনের সংশ্লিষ্টতা ও ‘কলকাঠি নাড়া’ দাবী করা হয়, প্রত্যক্ষ করা হয় দুই ছাত্রলীগের সংঘর্ষই। এছাড়া ফেব্রুয়ারী ৩ শহীদ মিনারে একজন প্রাক্তন জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীকে একজন কনিষ্ঠ শিক্ষার্থীর, এপ্রিল ৮ দুইজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে একদল কনিষ্ঠ শিক্ষার্থী প্রহার করে। এছাড়াও, জুলাই ১৭ তে আগস্ট নিয়ে ফেইসবুক স্ট্যাটাসের জের ধরে শিক্ষকের কক্ষ ভাঙচুর, জুলাই ১৯ তারিখে র‍্যাগিং নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগে ঘুরেফিরে ছাত্রলীগ কর্মীর নাম আসে।

ফেব্রুয়ারী ও জুলাই ১৯ তারিখের দুইটা বাদ দিলে, সাস্টনিউজ টোয়েন্টি ফোর ডট কমের হিসেব অনুযায়ী, একবার পথশিশু খাওয়ানোর বিপরীতে শাবিপ্রবিতে এখন পর্যন্ত মোট আটটি (৮) উগ্রতার পরিচয় প্রদর্শন করেছে শাবিপ্রবি ছাত্রলীগ। জুলাই ১৭ এর টা ‘নৈতিক উগ্রতা’ বলে পার পাবার উপায় নেই, কারণ সিন্ডিকেটে ঐ শিক্ষকের বিরুদ্ধে যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, তাতে ভাঙচুর ভূমিকা রাখে না; অর্থাৎ আরও সোজাভাবে বললে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে সভায় উপস্থিত সভ্যদের মতামতের ভিত্তিতে, শাবিপ্রবি ছাত্রলীগের ভাঙচুরের ভিত্তিতে নয়। কাজেই শাবিপ্রবি ছাত্রলীগ প্রশাসনিক নিয়মের ভিতরেই এর নিন্দা জানাতে পারত, সেই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার আবেদন জানাতে পারত। কিন্তু এই ভাংচুরের বিষয়টি ‘প্রশাসনের ভেতরকার প্রশাসনের’ দাম্ভিকতাকেই প্রকাশ করে। 

ফেব্রুয়ারী ৩ ও এপ্রিল ৮ এর ঘটনা দু’টি ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষ না হলেও, রাজনৈতিক ছত্রছায়া থাকার কারণেই আক্রমণকারী শিক্ষার্থীরা ঘটনা দু’টি ঘটিয়েছে। বিগত ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় দু’টি বিভাগের খেলোয়াড়দের মাঝে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়, এবং এর আগে আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় বাস্কেটবল প্রতিযোগিতায় শাবিপ্রবির এক শিক্ষক কর্তৃক জাবি’র এক শিক্ষকের শার্টের কলার খামচে ধরা ছাড়া, বিগত কয়েক বছরে যত উগ্রতার প্রদর্শনী দেখেছে শাবিপ্রবি প্রাঙ্গণ, তার সব কয়টিই রাজনৈতিক ছত্রছায়া থাকার কারণেই সম্ভব হয়েছে। (শিক্ষকের ঘটনাটিতে অবশ্য রাজনীতির কিছুটা সূত্র আছে। যেই শিক্ষক এই কাজটি করেছিলেন, ছাত্রাবস্থায় তিনি শাবিপ্রবিতে ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন, এবং উপাচার্য মোসলেহ উদ্দীনের সময় সহকারী প্রক্টর হিসেবে তাঁর, ছাত্রদের কলার খামচে ধরার ছবি পাওয়া যায় ইন্টারনেটে। অর্থাৎ, এই আগ্রাসী মনোভাবে পেছনে রাজনীতির প্রভাবযুক্ত অতীতের চর্চার প্রকাশ আছে।) আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন কয়েক বছর আগে শিবিরের বাস ভাঙচুরের পরে শিক্ষাঙ্গনে সব কয়টি সহিংস কর্মকাণ্ডই হয় শাখা ছাত্রলীগের নিজেদের দুই পক্ষে, নতুবা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে রাজনৈতিক কর্মীর গণ্ডগোল। পেছনে ‘হলের ভাই’ না থাকলে শাবিপ্রবির কোন শিক্ষার্থীকে কোন এক বা একাধিক সাধারণ শিক্ষার্থী অপদস্থ, লাঞ্ছিত বা প্রহার করেছে, এমন উদাহরণ পাওয়া যায় নি।

আমরা যদি একটু পেছনে ফিরে তাকাই, শাবিপ্রবির গায়ে কালিমা লেপন করে দেয়া কুখ্যাত বদরুল কাহিনীর দায় ছাত্রলীগ এড়াতে পারে না, কেন না, সরাসরি ছাত্রলীগের ভূমিকা এখানে শূন্য হলেও, দলটিতে সহিংস আচরণের যে চর্চা বর্তমানে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা বদরুলদের তৈরী করতে ভূমিকা রাখে বৈকি। এর প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডেও – ‘চিন্তাভাবনা পরে, আগে মার’। (কয়েক বছর আগে কিছু ছাত্রলীগ নেতার ‘নির্দেশে’, বাসস্ট্যাণ্ডের কাছে খাদ্য বিক্রয়কেন্দ্রসমূহে ধূম্রশলাকা বিক্রি করা বন্ধ ছিল, তবে প্রথমত শেষ পর্যন্ত তা কাজ করে নি, দ্বিতীয়ত তা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কোন কর্মকাণ্ড ছিল না, তৃতীয়ত, দলের কিছু নেতার এই ‘নির্দেশ’ না মানলে কি হবে সেই ‘ভয়’ দলের কোন কোন কর্মকাণ্ডে তৈরী হয়েছে সেটাও বিবেচ্য বিষয়। তবে এক কথায় বলতে গেলে এটি একটি ভালো কাজ, এবং ভালো কাজই শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা শাবিপ্রবি ছাত্রলীগের কাছ থেকে প্রত্যাশা করে।)

সহিংস আচরণ ছাড়াও, মূলধারার রাজনৈতিক তিনটি দলই ‘ক্ষমতার প্রদর্শনী’ দেখায় অন্যভাবেও। এর মাঝে আছে সশস্ত্র শিক্ষাঙ্গন প্রদক্ষিণ, সংগঠনের অস্থিতিশীল সময়ে উপাচার্যের সাথে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে থাকা এবং মূল বা অঙ্গসংগঠনের কোন নেতা শিক্ষাঙ্গনে আসলে তার সামনে নিজ গ্রুপের কর্মীদের নিয়ে স্লোগান দিয়ে দাম্ভিকতা প্রদর্শন। শেষোক্তটি কিছুদিন আগে ঘটেছে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বলতে যদি এসব উদাহরণ স্থাপন করতে চায় শাখা ছাত্রলীগ, তাহলে বলতে হয় তাদের ইতিহাস জ্ঞান একেবারে দুর্বল, অথবা মুখে ‘আদর্শের সৈনিক’ বলে তারা মিথ্যাচার করছে, এটা স্বীকার করে নিতে হবে।

গত আগস্ট ১ তারিখে শিক্ষাঙ্গনে পরিবহন খাতের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে ছাত্রফ্রণ্ট, এবং ১৪ তারিখ পর্যন্ত গণস্বাক্ষর কর্মসূচী পালন করা হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে এই অসঙ্গতি এখনও প্রমাণিত না, এখনও এটা ছাত্রফ্রণ্টের ‘নিজস্ব হিসাব’, তবে মূল বিষয়টা হল তারা তাদের দৃষ্টিতে যেটাতে সমস্যা দেখেছে, অন্যায় দেখেছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। অথচ, ‘চতুর্থ শ্রেণীর অধিকার আদায়ের আন্দোলনে’ জড়িত থাকা যে বঙ্গবন্ধুর কথা আমরা শুনি, ন্যায্য অধিকার আদায়ের মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত যে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কথা আমরা জানি, তাঁর আদর্শ অনুসরণ করলে, এই অসঙ্গতিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করার কথা ছাত্রলীগের। এটা বর্তমানে অস্বীকার করার উপায় নেই, এবং বলতে গেলে ‘খোলামেলা গোপন কথা’ এই যে, বাংলাদেশে যেই ক্ষমতায় আসুক না কেন, গণবিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় সেই মতাদর্শের অনুসারী লোকদের একজন, প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পান তাঁর সমর্থক শিক্ষকবৃন্দ, এবং বিদ্যায়তনে ‘ক্ষমতাশালী দল’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন। সে হিসেবে প্রশাসনের কোন অসঙ্গতি থাকলে তা অনেকটা ‘ঘরের খবর’ হয়ে দাঁড়ায়, এবং ‘ঘরের খবর’ নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন এদেশে নিতান্তই দুর্লভ। সে হিসেবে বিক্ষোভ না দেখিয়ে, আলোচনার মাধ্যমেও অন্তত সমস্যার সুরাহা করা যায়।

কিন্তু যদি অন্তত এই বছরের শুরু থেকেও আজ পর্যন্ত ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখব ‘এলাকা চিহ্নিতকরণ ও নিয়ন্ত্রণ’ এবং ‘স্পর্শকাতর ধর্মসমতুল্য রাজনৈতিক অনুভূতির’ বহির্প্রকাশ ছাড়া আর কোন রাজনৈতিক আচরণ শাখা ছাত্রলীগ দেখাচ্ছে না। এক কথায়, ব্যানারে ও স্লোগানে ছাড়া বঙ্গবন্ধু তাদের আদর্শে নেই। চলমান বছরের প্রেক্ষিতে এই কথাটিকে ভুল প্রমাণের জন্য এখনও আরও একশত সাঁইত্রিশ দিন আছে।

আজকের এই দিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি সাস্টনিউজ টীমের পক্ষ থেকে রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।


আপনি কি মনে করেন শাবিপ্রবিতে ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে?

View Results

Loading ... Loading ...
Share via email

ক্যাটাগরি অনুযায়ী সংবাদ

এই সংবাদটি ১৫ আগস্ট ২০১৭ইং, মঙ্গলবার ০টা ১০মিনিটে সম্পাদকীয়, সর্বশেষ ক্যাটাগরিতে প্রকাশিত হয়। এই সংবাদের মন্তব্যগুলি স্বয়ঙ্ক্রিয় ভাবে পেতে সাবস্ক্রাইব(RSS) করুন। আপনি নিজে মন্তব্য করতে চাইলে নিচের বক্সে লিখে প্রকাশ করুন।

Leave a Reply

300 x 250 ad code innerpage

Recent Entries

120 x 200 [Sitewide - Site Festoon]
প্রধান সম্পাদক: সৈয়দ মুক্তাদির আল সিয়াম, বার্তা সম্পাদক: আকিব হাসান মুন

প্রকাশিত সকল সংবাদের দায়ভার প্রধান সম্পাদকের। Copyright © 2013-2017, SUSTnews24.com | Hosting sponsored by KDevs.com