360 x 130 ad code [Sitewide - Site Header]

এক সিকি হাম হাম

Share via email

ভোপেনের দিনলিপি


তখন বসন্ত কাল। চারিদিকে থৈ থৈ পানি। বোর কৃষকের মাথায় হাত। এরই মাঝে এক সকালে ট্রেন চাপলাম। যাত্রাপথ ভানুগাছ হয়ে হাম হাম জলপ্রপাত। তখনও আমরা জানি না আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে। দুই পাশে পানি রেখে ট্রেন এগিয়ে চলছে। যতদূর চোখ চায় পানি আর পানি। আর এই পানির আধ হাত নিচে আছে এক হাত সমান ধান গাছ।

হাম হাম মাধবপুর লেইক কিংবা রাসমেলা দেখতে আমরা যারা শ্রীমঙ্গল ব্যবহার করি তাদের কাছে ভানুগাছ একটা ভাল অপশন।

জয়ন্তিকা যখন ভানুগাছ থামে বেলা তখন দশ। সিএনজি অটোরিকশায় আমরা তারপর চা বাগানের ভেতর ঢুকে পড়লাম। এবং সেটা আক্ষরিক অর্থেই। আমরা চা বাগানের মেঠো পথে একে বেঁকে আগাচ্ছিলাম। উঁচু-নিচু জমি। চা বাগান তো না, সবুজ গালিচার ঢেউ।

মাঝে মাঝে চা-শ্রমিক পাড়া; মন্দির। কারো উঠানে চা গাছ আবার কোন মন্দিরের বাগানে চা গাছ। তারা চা’তে থাকে, চা’তে বাঁচে, চা’তে খায়, চা’তে ঘুমায়। চা’য়ের বাইরে তাদের কোন চিন্তা নাই। চা বাগানের বাইরে তাদের কোন তৎপরতা নাই।

বেলা তখন বারো। আমরা পড়লাম শেষ মাথায়। কলাবন। বাংলাদেশের সীমানার এদিকটায় এরপর আর বসতি নাই। এখান থেকেই মূলত হাম হাম যাত্রা পথ শুরু। আমরা তখনও জানি না, এতক্ষণ যা ছিল তার সবই ছিল দুধ-ভাত!

শুরুর আগে এখানে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করে যাওয়া জরুরী। তা না হলে ফিরে এসে পেটে পাথর বাধা লাগবে। আমরা ডাল-ভাতের সাথে হাঁসের বন্দোবস্ত করে যাই। এ কোন হোটেল কিংবা রেস্তোরা না। নিজ গৃহে রান্না করে নিজ উঠানের আকাশের নিচে পরিবেশন করানো হয়। যাওয়ার আগে হাতে করে একটি করে লাঠি নেয়া বাঞ্ছনীয়। পথপ্রদর্শক সমেত রওয়ানা দেই জঙ্গল পাহাড় ঝর্না আর জোঁকের পথে।

চারিপাশে ঘন বন। কাঠবিড়ালী কি বানরের পাল চোখে পড়বে। আর এক আধটা সাপ খোপ। ছোট ছড়ার জলধারা আপনার মন রঞ্জিত করবে। নিজেকে এমুহূর্তে সার্ভাইভাল সিচ্যুয়েশনের ব্রেয়ার গ্রেলস মনে হতে পারে। পার্থক্য একটাই – সেখানে আপনাকে ঘর বানাতে হবে না, রান্না করা লাগবে না। তবে খাবার খোঁজা লাগবে। দুইটা পাহাড় চড়ার পর যখন উরুর পেশীতে তীব্র চাপ অনুভব করবেন প্রথমেই খাবার খুঁজবেন। তাই সাথে কলা স্যালাইন কিংবা অন্য শক্তিবর্ধক খাবার রাখুন।

আধা ঘণ্টা পর যখন এক বাঁশুরের (যে বাঁশ কাটে) সাথে দেখা; তিনি জানান, আমরা অর্ধেক পথ চলে এসেছি। আর মাত্র সাত’টা পাহাড় পড়েই ঝর্না। চোখ কপালে উঠার যোগাড়। আরও দুইটা পাহাড় পাড় হয়ে দেখি উনি এখানেও কিছু বাঁশ কেটে রাখছেন!

আমাদের সঙ্গে নেয়া পানি ততক্ষণে শেষের পথে। বারোতম পাহাড়ের চূড়ায় উঠে আকাশের দিক মুখ করে কিছুক্ষণ শুয়ে রইলাম। আহা! কি সুন্দর! কি শান্তি! পুরো জার্নিতে যে কয়বার শুয়ে ছিলাম, স্বর্গীয় লাগছিল। তবে, ছোট বড় মশা ওখানের জোঁকের চেয়েও ভয়ানক। কেননা আপনি জানেন না সে তার ঠোঁটে কি বহন করছে‍!

‘নেকেড এন্ড এফ্রেইড’-এ ঐ অবস্থা ও পরিবেশে এত গুলো রাত কাটানোর পরও কেন দুইজনের মধ্যে কোন আবেগের আদান-প্রদান হয় না, বুঝতে পাড়লাম। আবেগ দেখানোর জায়গা ওটা না। ‘ম্যান ওম্যান ওয়াইল্ড’-এ দেখানো হয় পৃথিবীর দুর্গমতম জায়গায় কোন দম্পতিকে ফেলে আসলে তারা কি করেন। কিভাবে বেঁচে ফিরেন। খুব ইচ্ছে ছিল। এখন আর নাই। ওসব টিভির ভেতরেই সুন্দর, আমরা তার সামনে।

শেষের খাড়া পাহাড়টি ভাল মাপতে পারি নি। ঐ খেয়াল ছিল না। তবে শ’দুয়েক ফুট তো চোখ বন্ধ করে হবে। মাঝামাঝিতে পৌঁছুলে নিচের পানি চলার শব্দ আপনাকে বেগবান করতে পারে। শীতল ঠাণ্ডা পানিতে শুয়ে থেকে দুইশ ফুট উপরে কি হয়েছিল আমার সাথে ভুলে গিয়েছিলাম। হাঁপাতে হাঁপাতে ব্রেয়ার গ্রিলসের মত বলতে ইচ্ছে করছিল, কি যে অসম্ভব ভাল লাগছে, বলে বুঝাতে পাড়ব না। এটি স্বয়ং ঈশ্বরের আশীর্বাদ।

এবেলা শুরু ‘পানি-পথের যুদ্ধ’। আমরা আসছি শুনে এক পাহাড়ি ঢল আমাদের পথ আগলে দাঁড়ায়। অস্ত্র বিনে কি আর যুদ্ধ চলে? আবার উঠলাম টিলার গায়ে। ভাঙ্গা বাঁশ পঁচা বাঁশ জোঁক ঠেলে আমরা এগিয়ে চললাম। জোঁক আমাদের অহিংস যাত্রা রক্তাক্ত করে তুলল। অনেক চরাই উৎরাই পেরিয়ে একসময় আমরা আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পদচিহ্ন একে দেই। বেলা তখন তিনটে।

মিনিট ত্রিশেক কাটিয়ে যখন ফিরতি পথে পা বাড়াই। শরীরে তখন শুরুর এনার্জি। এবার পাহাড় গুনি। বাঁশুরে থেকে আমার গোণা পাহাড়ের সংখ্যা সামান্য বেশী। সেটা আঠারো কি বিশ। ক্যাম্পিং করার জন্য জায়গাটি উপযুক্ত কিন্তু একই দিনে যাওয়া আসাটা আমাদের মত আনকোরাদের জন্য নিদারুণ কষ্টকর।

বেস ক্যাম্পে মানে কলাবন ফেরত এসে হাত মুখ ধুয়ে কি না ধুয়ে আমরা হামলে পড়লাম ভাতের টেবিলে। চমৎকার আথিথেয়তা। বলতে পারেন, টাকা নিয়েছে, খাবার দিয়েছে – এ আর এমন কি? কিন্তু সাদা মনের ঐ কালো মানুষগুলার চোখ দেখলে বুঝা যায়। বিদ্যুতের টানা তার এখনও ওখানে পৌঁছে নাই। কেউ কেউ সৌর বিদ্যুৎ চালায়। বিনোদনের খুব একটা ভাল ব্যবস্থা নাই, থাকলে টিভি এন্টেনা চোখে পড়ত। নিকট দূরত্বে কোন স্কুল না থাকায় পর্যটকদের কাছে লাঠি বিক্রি করা ছাড়া পাড়ার বাচ্চাগুলোর আর কোন কাজ নাই।

ফেরার সময় সন্ধ্যা। একটা খোলা মাঠের পাশে চা বিক্রয় কেন্দ্র। আবার শুয়ে পড়লাম আকাশে মুখ দিয়ে। কিছুক্ষণ সন্ধ্যার আযান শুনার চেষ্টা করে বুঝলাম এই তল্লাটে এখনও আজানের ধ্বনি পৌঁছায় নি। নিজের চেনা দুনিয়ার বাইরে অন্য একটা সুন্দর পৃথিবী। আযান না পড়লেও এখানে সন্ধ্যা হয়। রাতের কুপি জ্বলে। স্থানীয় হাসপাতালটিতে আদিমতা লক্ষ্যণীয়। সিভিল সার্ভিসের এরচেয়ে বড় প্রদর্শনী আর চোখে পড়ে নি ওখানে। বাইরের জগৎটা তাদের অচেনা। তারপরেও চোখে মুখে কত তৃপ্তির ছড়াছড়ি।

কর্তা ভদ্রতা করে আবার আসার নেমন্তন্ন করেন। ওনার কথা মানুষকে জানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম।


* লেখক মূল পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক।

** খোলা কলম বিভাগে প্রকাশিত লেখার যাবতীয় বক্তব্যের দায় লেখকের।

Share via email

ক্যাটাগরি অনুযায়ী সংবাদ

এই সংবাদটি ৭ আগস্ট ২০১৭ইং, সোমবার ২২টা ০৬মিনিটে অতিথি লেখক, সর্বশেষ ক্যাটাগরিতে প্রকাশিত হয়। এই সংবাদের মন্তব্যগুলি স্বয়ঙ্ক্রিয় ভাবে পেতে সাবস্ক্রাইব(RSS) করুন। আপনি নিজে মন্তব্য করতে চাইলে নিচের বক্সে লিখে প্রকাশ করুন।

Leave a Reply

120 x 200 [Sitewide - Site Festoon]
প্রধান সম্পাদক: সৈয়দ মুক্তাদির আল সিয়াম, বার্তা সম্পাদক: আকিব হাসান মুন

প্রকাশিত সকল সংবাদের দায়ভার প্রধান সম্পাদকের। Copyright © 2013-2017, SUSTnews24.com | Hosting sponsored by KDevs.com