360 x 130 ad code [Sitewide - Site Header]

ভর্তি আবেদন ফি বৃদ্ধি ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন

Share via email

সম্পাদকীয়

sustnews-logo-post

শাবিপ্রবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের নামে একটি দুর্নাম ছিল তারা অধিকার আদায় করে নিতে জানে না, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ায় না; চলমান আন্দোলন সেই দুর্নামের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়। তবে, এতদিন যে অল্প অল্প করে বৃদ্ধি হচ্ছিল, তার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা সোচ্চার হলেন না, হঠাৎ ২০১৬-১৭ ভর্তি কার্যক্রমের বেলায় সোচ্চার হলেন, এই বিষয়টি এই প্রশ্নেরই জন্ম দেয় – মোটা দাগে কোন ঘটনা না ঘটলে কি শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করবে না? আন্দোলনকারীরা এবং তাদের সমর্থনে অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকা জানাচ্ছেন ভর্তির আবেদন ফি বাড়ানো অযৌক্তিক। সেটি কি কেবল এইবারের বেলায় অযৌক্তিক, না প্রতিবছর দফায় দফায় বাড়ানোর ক্ষেত্রেও অযৌক্তিক সেটি দেখতে হলে কিছু বিষয় জানতে হবে।

২০১৫ সালের তুলনায় এবার ভর্তি আবেদন ফি বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৩ শতাংশ, তবে ২০০৮ সালের বিবেচনায়, এবছর দুই ইউনিট মিলিয়ে গড়ে প্রায় ২৩৯ শতাংশ বেড়েছে ভর্তি আবেদন ফি। এই ফি বৃদ্ধিকে প্রতিবছর ‘মূল্য স্ফীতির কারণে আনুষঙ্গিক খরচ বৃদ্ধি’ দেখিয়ে ন্যায্য বলে প্রতিপাদন করা হয়। অথচ, ডলারের বিপরীতে টাকার মান হিসাব করলে ২০০৮ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে টাকার মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ, গত বছরের তুলনায় গড়ে প্রায় ১.০৯ শতাংশ; মাঝে ২০১২ সালে ২০০৮ সালের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল যা গত দশবছরের মাঝে সর্বোচ্চ। তবে মূল্যস্ফীতির সাথে খরচ বৃদ্ধি সরাসরি সম্পর্কযুক্ত নয়। অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশ হলে দ্রব্যের মূল্য সবসময় যে ২ শতাংশ বাড়ে তা নয়, এর বেশিও বাড়তে পারে।

একই সাথে আমরা যদি শিক্ষদের বেতন কাঠামোর দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব ২০০৯ সালের তুলনায় বেতম কাঠামোতে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম স্তরের জন্য গড়ে মূল বেতন যা ছিল তার তুলনায় ২০১৫ সালে গড়ে প্রায় ৬৯ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিবছর ভর্তি আবেদন ফি এবং সেমিস্টার ও ক্রেডিট ফি বৃদ্ধির সাথে যদি বেতন বৃদ্ধির সম্পর্ক দেখানো হয়, তবে তা কতটুকু যুক্তিযুক্ত তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ এই বর্ধিত বেতন নিশ্চয়ই এককালীন ভর্তির আবেদন ফি দিয়ে উঠে আসবে না। আর সরকার যেখানে ভর্তুকি দেয়, সেখানে শিক্ষার্থীদের সেমিস্টার ফি ও ক্রেডিট ফি বাড়ানো সমর্থনযোগ্য কি না তা বিবেচনার বিষয়।

‘আনুষঙ্গিক খরচ বৃদ্ধি’ বলতে কি বোঝায় তার একটা ধারণা পাওয়া গিয়েছে শাবিপ্রবি ছাত্রলীগের সভাপতি পার্থর কাছ থেকে। তিনি জানিয়েছেন, প্রতিবছর ভর্তি কার্যক্রমের জন্য নতুন করে সরঞ্জামাদি কিনতে হয়, যার কারণে ছাত্রলীগ প্রশাসনের কাছে স্থায়ী ‘ভর্তি দপ্তর’ প্রতিষ্ঠার দাবী জানায়। স্বাভাবিক বোধশক্তি বলে, একটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে এত মেধাবী কর্মকর্তা থাকতে, প্রতিবছর সরঞ্জামাদি নতুন করে কেনার সমস্যার সমাধান নিজেরাই করে ফেলতে পারার কথা, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে দাবী উত্থাপনের পরে নয়।

বিশ্বস্ত একটি সূত্রে জানা গিয়েছে, ভর্তি কার্যক্রমের দায়িত্ব প্রতিবছর একেকটি বিভাগকে দেয়া হয়, এবং সেই উদ্দেশ্যে কেনা ল্যাপটপ, এসি, ইত্যাদি অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি সেই বিভাগ নিজেদের জন্য রেখে দেয়। এভাবে বিভাগের কাঠামোর উন্নয়ন ঘটলে প্রতি অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য যে বরাদ্দ দেয়া হয় তা কিভাবে খরচ করা হয় তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে।  বিশ্বস্ত অপর আরেকটি সূত্রে জানা গিয়েছে, গত বছরের তুলনায় এবছর ভর্তি কমিটির সকল উপকমিটি মিলিয়ে জনবল প্রায় তিন-চারগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এটি করা হয়েছে দুই প্রক্রিয়ায়। প্রথমে প্রতিটি উপকমিটিকে এবার কয়েকটি উপকমিটিতে বিভক্ত করা হয়েছে। যেমন, গত বছর যদি (কল্পিত) ‘স্ক্যানিং ও ট্যাবুলেশন’ নামে কোন উপকমিটি থেকে থাকে, তবে এবছর এটি ভেঙ্গে ‘স্ক্যানিং’ ও ‘ট্যাবুলেশন’ নামে দুইটি উপকমিটি করা হয়েছে। তার উপর, গতবছর যদি প্রতিটি উপকমিটিতে ১৬-১৭ জন করে সদস্য থাকেন, এবছর প্রতিটি উপকমিটিতে ২৬-২৭ জন করে সদস্য আছেন। কাজেই গত বছর যদি একটা উপকমিটিতে ১৬ জন সদস্য থাকেন, এবছর সেটিকে ভেঙ্গে দুইভাগে (ক্ষেত্র বিশেষে তিন-চার) বিভক্ত করে মোট ৫২ জন সদস্য নির্বাচন করা হয়েছে। শোনা গিয়েছে, এই কারণে এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় প্রতিটি শিক্ষকই এবার কোন না কোন উপকমিটিতে আছেন। বর্ধিত জনবলের সংখ্যা দেখিয়ে ভর্তি ফরমের বর্ধিত মূল্যের বৈধতা নেয়া হয়েছে একাডেমিক কাউন্সিলের কাছ থেকে। তবে এসমস্ত তথ্যের কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নি।

প্রমাণিত না হলেও ডক্টর জাফর ইকবাল অন্যান্য অনেক শিক্ষক যেরকমভাবে ফি বৃদ্ধিকে ‘ভর্তি বাণিজ্য’ বলে আখ্যায়িত করেছেন, তার একটা আভাস পাওয়া যায় এসব ‘শোনা কথায়’। এবারের এই বর্ধিত ফি এর কারণে অনেক ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী হয়তো আবেদন করবেন না, যা শাবিপ্রবির জন্য ক্ষতিকর। বদরুল ঘটনা, সাকি ঘটনার পর ভর্তি আবেদন ফি বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে শাবিপ্রবির ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর। এই বর্ধিত ফি প্রত্যাহারের যে দাবী তুলেছেন শিক্ষার্থীরা, তাদের সে দাবী সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত নয়। এ দাবীর ক্ষেত্রে এবারের ভর্তির আবেদন ফি হুবহু আগের বছরের সমান রাখতে হবে কি না, না প্রতিবারের মত ৫০-১০০ করে বাড়ানো যাবে, যদি গতবছরের সমান থাকে তবে ভবিষ্যতে বাড়াতে হলে কি প্রক্রিয়ায় তা হতে পারে, ভর্তি প্রক্রিয়ার হিসাবের স্বচ্ছতা কিরূপে নিশ্চিত করা হবে – এসব বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তাছাড়া স্থায়ী ‘ভর্তি দপ্তর’ স্থাপিত হলে সেটির রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণ দেখিয়ে আবার ভর্তির আবেদন ফি বাড়ানো হয় কি না সে ব্যাপারেও লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন।

প্রচলিত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য না থাকলে, প্রশাসনের কোন সিদ্ধান্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও অন্যান্য সক্রিয়তা তাদের সচেতনতার ইঙ্গিত দেয়। এই আন্দোলনকে ইঙ্গিত করে শাবিপ্রবির উপাচার্য মহোদয় টেলিভিশনে বলেছেন ‘কোন রকম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যাবে না’। এরপর ছাত্রলীগ নীরবতা ভেঙ্গে আন্দোলনের সাথে ‘সহমত’ পোষণ করে, এবং প্রশাসনের সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে। কোন মিছিল, স্লোগান ব্যতীত একটি রাজনৈতিক সংগঠনের দাবী উপস্থাপনের বিষয়টি সত্যিই বিরল একটি ঘটনা। আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, শিক্ষক আন্দোলনের সময় শিক্ষক লাঞ্ছনার ব্যাপারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট আন্দোলনে যাবার সিদ্ধান্তের দিকে আগালে প্রশাসন থেকে তাদেরকে আন্দোলন শুরু হবার পূর্বেই শান্ত পরিস্থিতিতে আশ্বাস দেয়া হয় যে, এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হবে, কিন্তু আজ পর্যন্ত তা নিয়ে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয় নি। সেসময় শিক্ষার্থীরা বিচ্ছিন্নভাবে আন্দোলন করলেও, জোটের অনুপস্থিতে তাদের আন্দোলনকে ‘নেপথ্যে শিক্ষদের দ্বারা পরিচালিত’ আন্দোলন বলে আখ্যায়িত করা হয়। কাজেই ইতিহাস অনুসারে শান্ত পরিবেশে ‘সুশৃঙ্খল আলোচনা’ খুব একটা ফলপ্রসূ হয় নি, সাধারণ শিক্ষার্থীদের সবসময় উচ্চকণ্ঠ আন্দোলন করেই দাবী আদায় করে নিতে হয়েছে। প্রশাসনিক কাজে বাধা না দেয়া কিংবা কোন অশোভন আচরণ না করা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের উচ্চকণ্ঠকে ‘বিশৃঙ্খলা’ বলা কতটুকু যৌক্তিক তা ভেবে দেখার বিষয়। ভর্তি কার্যক্রম নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব একটি বিশৃঙ্খলার পরিচায়ক, এবং এতে অবকাঠামোর অন্যান্য অংশও প্রভাবিত হবে, সেটি সারা বিশ্বের জন্য সর্বত্র প্রযোজ্য।

‘সংশ্লিষ্ট কাজে খরচ বৃদ্ধি’র যে যুক্তি দেখানো হয়েছে, তা খুব সহজেই সমাধান করা যায় সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা প্রণয়নের মাধ্যমে। এর মাধ্যমে সারা দেশের ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর অযথা আর্থিক, মানসিক ও শারীরিক হয়রানি কয়েক গুণে লাঘব করা যায়। এই ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক তার ফেইসবুক স্ট্যাটাসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। সারা দেশের শিক্ষার্থী ও বিবেকবান মানুষদের এ প্রাণের দাবী বাস্তবায়নের জন্য যদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আদেশের প্রয়োজন হয়, তবে সেটি হবে সত্যিই দুঃখজনক ব্যাপার, যেখানে বিষয়টি বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষার্থীদের অভিভাবকতুল্য শিক্ষকদের সদিচ্ছাই যথেষ্ট। কাজেই সারাদেশে ভর্তি আবেদন বা ফরমের মূল্য বৃদ্ধি ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াতসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বৃদ্ধির সমস্যার মূলোৎপাটন করতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি কিভাবে প্রণয়ন করা যায়, সে বিষয়ে নজর দেয়া প্রয়োজন। কিন্তু, যদি শিক্ষকেরা এ প্রস্তাব বাস্তবায়নে কিছুতেই সম্মত না হন, সারাদেশের সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একজোট হয়ে এ দাবী আদায় করে নিতে পারবে কি?

চলমান আন্দোলন সম্পর্কে বলা হয়েছে এই আন্দোলন অন্যান্য প্রশাসনিক ‘অনিয়ম’ নিয়ে কাজ করবে কি না তা পরে আলোচনার মাধ্যমে দেখা যাবে। ‘এটিএন নিউজ’ চ্যানেলের ‘ইয়াং নাইট’ অনুষ্ঠানে ‘ভর্তি ফরমের মূল্য বৃদ্ধি বিরোধী শিক্ষার্থী মঞ্চ’র মুখপাত্র সারোয়ার তুষার এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, এতদিন এই বৃদ্ধি সহনীয় মাত্রায় ছিল, তাই আন্দোলনের প্রয়োজন পড়ে নি। ‘ক্রমাগত বৃদ্ধি ও সহনশীলতা’ নিয়ে একটা জনপ্রিয় পরীক্ষা আছে। এই আন্দোলনের মাধ্যমে প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পর্কের যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে, তা যদি অন্যান্য বিষয়, যেমন প্রতি শিক্ষাবর্ষে সেমিস্টার ও ক্রেডিট ফি বৃদ্ধি, সময়মত পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা ইত্যাদি বিষয়েও ছড়িয়ে না যায়, তবে শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের অবস্থা সেই ফুটন্ত পানিতে ব্যাঙের মতই হবে, যেটির ফুটন্ত পানির তাপমাত্রার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে নিতে একসময় লাফ দিয়ে পাত্র থেকে বের হয়ে যাবার শক্তিটুকুও আর অবশিষ্ট থাকে না, ফলে সেটি মারা যায়।

Share via email

ক্যাটাগরি অনুযায়ী সংবাদ

এই সংবাদটি ১৮ অক্টোবর ২০১৬ইং, মঙ্গলবার ১৪টা ২৮মিনিটে সম্পাদকীয়, সর্বশেষ ক্যাটাগরিতে প্রকাশিত হয়। এই সংবাদের মন্তব্যগুলি স্বয়ঙ্ক্রিয় ভাবে পেতে সাবস্ক্রাইব(RSS) করুন। You can leave a response or trackback to this entry

মন্তব্যসমূহ

120 x 200 [Sitewide - Site Festoon]
প্রধান সম্পাদক: সৈয়দ মুক্তাদির আল সিয়াম, বার্তা সম্পাদক: আকিব হাসান মুন

প্রকাশিত সকল সংবাদের দায়ভার প্রধান সম্পাদকের। Copyright © 2013-2017, SUSTnews24.com | Hosting sponsored by KDevs.com