360 x 130 ad code [Sitewide - Site Header]

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক হোক মধুময় ও কৃত্রিমতা বর্জিত

Share via email

মীর আন্-নাজমুস সাকিব:

“আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমরা যখন আমাদের ছাত্রছাত্রীদের পাই, তারা তখন অনেক বড় হয়ে গেছে, তাদের চরিত্রের মূল কাঠামোটি দাঁড়িয়ে গেছে। তারা আমাদের দেখে খানিকটা ভয়, খানিকটা সন্দেহের চোখে। যদি আমরা ঠিকভাবে আমাদের দায়িত্ব পালন করি তখন হয়তো খানিকটা শ্রদ্ধা করে, কিন্তু তাদের ভালোবাসাটুকু আমরা কখনো পাই না”।

– কথাগুলো বলেছেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রিয় শিক্ষক, ইইই বিভাগের বিভাগীয় প্রধান, প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। স্যারের কথা থেকেই স্পষ্ট বর্তমান যুগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক আর গুরু-শিষ্যের মতো নেই অর্থাৎ গুরু যা বলবে, শিষ্য তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করার মাধ্যমে ভালোবাসার আলিঙ্গনে নিজেদেরকে আবদ্ধ করে রাখবে- সেরকম অবস্থা বর্তমানে আর বিরাজমান নেই। এর মূল কারণ হল উভয় পক্ষের প্রত্যাশা। যে কোন সম্পর্কের মূল ভিত্তিই হল প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির যোগ। কিন্তু শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের এবং শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কাছ থেকে যে কতটা প্রত্যাশা করেন বা সে প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির যোগ যে কতটা তা খুঁজে বের করাটা বর্তমানে অতটা সহজ নয়।

একজন শিক্ষকের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রত্যাশা থাকে যেন তাঁর শিক্ষার্থীরা তাঁকে সম্মান করে, তাঁর উপদেশ মেনে চলে, পরীক্ষায় ভালো ফল করে এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে সফল হওয়ার চেষ্টা করে। অপরদিকে শিক্ষকদের কাছে শিক্ষার্থীদের চাওয়া-পাওয়া থাকে মানসম্মত পাঠদান, মনোযোগ, সৌহার্দ্য ও স্নেহ। তারা চায় শিক্ষকরা যেন তাদের সাথে বন্ধুর মতো আচরণ করেন, কঠোরতা পরিহার করেন। আবার কেউ কেউ প্রত্যাশা করে শিক্ষকরা একাডেমিক দিক দিয়ে তাদেরকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবেন, বিপদ-আপদে এগিয়ে আসবেন, সময়মতো পরীক্ষার খাতা দেখবেন, প্রশ্নপত্র পাঠদানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রণয়ন করবেন, তাদের উত্তরপত্রের মূল্যায়ন নিরপেক্ষ থেকে সঠিকভাবে করবেন। সর্বোপরি তারা কামনা করে যেন একজন শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডির ভেতরে তাঁদের সবচেয়ে আস্থাভাজন অভিভাবক হিসেবে নিজেকে মেলে ধরেন।

WTD2016_Poster_ENতবে বিভিন্ন কারণেই আজ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা একে অপরের প্রত্যাশাগুলোকে পূরণ করতে পারছেন না। কোন শিক্ষকের কৃতকর্মের জন্য যদি তাঁর ভাবমূর্তি শিক্ষার্থীদের কাছে নেতিবাচক হয়ে পড়ে তবে সেই শিক্ষককে মন থেকে শ্রদ্ধা করা তাদের জন্য সম্ভব হয়ে ওঠে না। আবার শিক্ষার্থীরা অনেক সময় নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অভাবে শিক্ষকদের সাথে ভালো আচরণ করে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষকই ভালো এবং যোগ্য এটা আমি বিশ্বাস করি। ভালো শিক্ষকদের মানসম্মত ও আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতির অনুসরণ, গবেষণা দক্ষতা, বিনয়, সহযোগিতা ও প্রাঞ্জলতা শিক্ষার্থীদেরকে এতটাই মুগ্ধ করে যে, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার জায়গাটা এমনিতেই তৈরি হয়। তবে কিছু কিছু শিক্ষক আছেন যাঁরা অনেক ক্ষেত্রে প্রাচীন ধারার নীরস ও গবেষণা বিবর্জিত শিক্ষাদান পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকেন, অনেক সময় পাঠ্যসূচিও তাঁদের সিদ্ধহস্ত থাকে না। ফলে মানসম্মত ও আধুনিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয় শিক্ষার্থীরা। এভাবে সৃষ্টি হয় সম্পর্কের টানাপোড়েন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় পাঠদান ও পরীক্ষা পদ্ধতির দুর্বলতা, ফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রিতাসহ নানা কারণে শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের দারস্থ হলে, তাঁরা তাদের সাথে অসৌজন্যমূলক ও অসহযোগিতামূলক আচরণ করেন। অপরদিকে অনেক সময়েই দেখা যায় বিভিন্ন ইস্যুতে শিক্ষকদের সদিচ্ছা থাকলেও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে তাঁরা শিক্ষার্থীদের চাওয়া-পাওয়াকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেন না। কিন্তু সেসময়েও শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের অসহায়ত্বকে অগ্রাহ্য করে তাঁদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাজনৈতিক, লৈঙ্গিক বা ধর্মীয় আধিপত্যের কারণে শিক্ষক শিক্ষার্থীকে এবং শিক্ষার্থী শিক্ষককে মোসাহেবি করছেন কিংবা বিষোদাগার বা অসহযোগিতা করছেন, যা কখনোই কাম্য নয়। আবার অনৈতিক সুবিধা পাওয়ার আশায় কোন কোন শিক্ষককে কোন কোন শিক্ষার্থী বা কোন কোন শিক্ষার্থীকে কোন কোন শিক্ষক মোসাহেবি করে থাকেন, যেটিও কারুরই কাম্য নয়। আসলে এ ধরনের কৃত্রিমতা শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মাঝের সম্পর্ককে অনেকটা লেনদেনের বিষয়ে পরিণত করে। আর এ লেনদেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে। আসলে শিক্ষক মানসম্মত গবেষণা ও প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষাদান করবেন, নিজেদের স্বার্থের জন্য শিক্ষার্থীদেরকে ব্যবহার বা জিম্মি করা থেকে বিরত থাকবেন এবং পরীক্ষা সংক্রান্ত নানা বিষয়সহ বিভিন্ন ইস্যুতে শিক্ষার্থী বান্ধব হবেন, তাদের বিপদে-আপদে সহযোগী অভিভাবক হবেন এটাই যেমন সবার কাম্য; ঠিক তেমনি শিক্ষার্থীরাও সময়মতো শিক্ষকদের দেয়া কাজ সম্পন্ন করবে, তাঁদেরকে শ্রদ্ধা করবে, তাঁদের কথা মেনে চলবে, তাঁদেরকে সহযোগিতা করবে, অসদাচরণ থেকে বিরত থাকবে এবং স্বার্থান্বেষী মহলের প্ররোচনায় অযৌক্তিক আন্দোলন থেকে বিরত থাকবে, এটাও কিন্তু সবারই কাম্য। তবে এসব কিছুই হতে হবে নিঃস্বার্থভাবে, কৃত্রিমতাকে বর্জন করে এবং রাজনৈতিক, লৈঙ্গিক ও ধর্মীয় পরিচয়কে পাশ কাটিয়ে। আসলে একজন আরেকজনকে ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার মিশেলে সহযোগিতা করার মাধ্যমেই এমন সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব।

তবে আশার কথা এই যে, বর্তমান প্রজন্মকে আমরা যতটা দুর্বিনীতই ভাবি না কেন আর বর্তমান শিক্ষকদেরকে যতটা নৈতিকতা বিবর্জিতই ভাবি না কেন, এটা সত্যি যে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাময় মধুর সম্পর্ক এখনো বিদ্যমান। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কারণেই আজও শিক্ষার্থীদের সাফল্যে নিজের সন্তানদের সাফল্যের মতোই খুশি হন শিক্ষক। শিক্ষকদের প্রাঞ্জল ও বন্ধুত্বপূর্ণ শিক্ষাদানের কারণে আজও শিক্ষার্থীরা নতুন নতুন নানা জিনিস শেখে, নিজেকে সমৃদ্ধ করে। আজও বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বনভোজন বা শিক্ষা সফরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা একসাথে আনন্দ করেন নেচে-গেয়ে। আজও সামাজিক ও ডিজিটাল মাধ্যমে আনন্দ-বেদনার বিষয়গুলোকে একে অপরের সাথে শেয়ার করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা, একে অপরকে পরামর্শ দেন। সৃষ্টিশীল কাজে এখনও শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ান শ্রদ্ধেয় শিক্ষকেরা। আমাদের সকলকেই সর্বদা মনে রাখতে হবে যে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে দূরত্ব কমে আসা এবং সহযোগিতার সম্পর্কের উন্নয়নের মধ্যেই রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়ন।

আজ ৫ অক্টোবর ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’। অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও যথাযথ মর্যাদার সাথে দিনটি উদযাপিত হচ্ছে। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য হল “Valuing Teachers, Improving their Status”। বর্তমান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মর্যাদা ও বেতন বৃদ্ধির জন্য নানা ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছে, সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে চলেছে তাঁদেরকে। তাই শিক্ষকদেরও উচিৎ শিক্ষার্থীদের মর্যাদা ও চাওয়া-পাওয়াগুলোকে গুরুত্ব দেয়া, তাদেরকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামকে হিমালয়ের সমান উচ্চতায় নিয়ে যেতে হলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই, বিকল্প নেই তাঁদের প্রত্যাশাগুলোর সাথে প্রাপ্তিগুলোর যোগসূত্র স্থাপনের। “শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক হোক মধুময় ও কৃত্রিমতা বর্জিত”– শিক্ষক দিবসে এই কামনাই রইলো। সবাইকে সাস্টনিউজ২৪ ডটকম’র পক্ষ থেকে ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’-এর শুভেচ্ছা।

 

লেখকঃ সাবেক সম্পাদক, সাস্টনিউজ২৪ ডটকম ও সাবেক শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, শাবিপ্রবি।

 

Share via email

ক্যাটাগরি অনুযায়ী সংবাদ

এই সংবাদটি ৫ অক্টোবর ২০১৬ইং, বুধবার ০টা ০১মিনিটে উদযাপন, শীর্ষ সংবাদ, সম্পাদকীয়, সর্বশেষ ক্যাটাগরিতে প্রকাশিত হয়। এই সংবাদের মন্তব্যগুলি স্বয়ঙ্ক্রিয় ভাবে পেতে সাবস্ক্রাইব(RSS) করুন। আপনি নিজে মন্তব্য করতে চাইলে নিচের বক্সে লিখে প্রকাশ করুন।

Leave a Reply

300 x 250 ad code innerpage

Recent Entries

120 x 200 [Sitewide - Site Festoon]
প্রধান সম্পাদক: সৈয়দ মুক্তাদির আল সিয়াম, বার্তা সম্পাদক: আকিব হাসান মুন

প্রকাশিত সকল সংবাদের দায়ভার প্রধান সম্পাদকের। Copyright © 2013-2017, SUSTnews24.com | Hosting sponsored by KDevs.com