360 x 130 ad code [Sitewide - Site Header]

আমাদের বন্ধু বিশ্বজিৎ মল্লিক

Share via email

তাসনিমা মুকিত রিহাঃ

13151599_1051126628275134_3011444609630849316_n

বিশ্বজিৎ মল্লিক। সাম্প্রতিককালে ক্যাম্পাসের খুব প্রসিদ্ধ নাম। ক্যাম্পাস এবং ক্যাম্পাসের সবার মুখে এখন কেবল একটাই কথা, কেন আত্মহত্যা করল ছেলেটি? কিন্তু দুইদিন আগেও কেউ চিনতো না ছেলেটিকে। কেউ চিনত না বলাটা আসলে ভুল হবে, চিনতো গুটিকয়েক ছেলেমেয়ে। তার সহপাঠী, বড় ভাই-আপুরা এবং পরিচিত ছোট ভাই-বোনেরা। বিভাগের পূজা কমিটিতে এ বছর শেষবারের মত কাজ করেছিল সে।কে জানত সবাইকে কাঁদিয়ে মা দিবসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে নিজের মায়ের কোল ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে যাবে সে?

 

শান্তশিষ্ঠ এই ছেলেটি বন্ধুদের আড্ডায় সবসময় হাসিমুখে বসে থাকতো। বন্ধুরা মিলে যখন খেপাত তখন একটিবারের জন্যও মন খারাপ করত না।সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়ত কিন্তু বিশ্ব কখনই খেপত না। বরং কোন বন্ধু রাগ করলে সবার আগে এগিয়ে আসত তার রাগ ভাঙ্গাতে।দুই বছর ধরে ছেলেটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সবার সাথে মিশে গিয়েছিল। তার অমায়িক ব্যবহার আর মুখের কোণে এক চিলতে হাসি মন জয় করে নিয়েছিল সবার।কেউ কখনই বিশ্বকে একটিবারের জন্যও রাগতে কিংবা উচ্চস্বরে কথা বলতে দেখেনি।ঠাণ্ডা প্রকৃতির এই ছেলেটিই এভাবে ঠাণ্ডা মাথায় আত্মহত্যা করতে পারবে তা কি কেউ কখনো ভেবেছিল?

 

আমি বিশ্বজিতের হতভাগা সহপাঠী। আমি বাঁচাতে পারিনি আমার বন্ধুকে। জানতে পারিনি কী এমন প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছিল সে যার জন্য কাউকে কিছু না বলেই হুট করে এরকম একটা কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলল সে। আমার মনে পরে, এবারের সরস্বতী পূজার সকালে যখন বিভাগে গেলাম, কোথা থেকে যেন দৌড় দিয়ে আমার জন্য প্রসাদ নিয়ে হাজির বিশ্ব। সবসময় আমাদের আড্ডায় বসে আমাদের কথা শুনত। খুব কম কথা বলত। নিজের সমস্যাগুলো কখনোই শেয়ার করত না। জানিনা কোন শান্তির খোঁজে এভাবে চলে গেলি? শুধু প্রার্থনা করি তুই শান্তিতে থাক। ভালো থাকুক আমাদের বন্ধু।

 

ঐ হাসিমুখের আড়ালে আসলে ঠিক কতটা দুঃখ লুকায়িত ছিল তা কেউ কখনো জানতে পারেনি। কাউকে কখনই কিছু জানতে দেয়নি বিশ্বজিৎ।সব রহস্য নিজের মধ্যে গুটিয়ে নিয়েই সে চলে গেল। রেখে যায়নি কারো জন্য কোন বার্তা। কাউকে জানতে দেয়নি তার মধ্যে লালন করে রাখা কষ্টগুলোকে।

 

বিশ্বজিৎকে নিয়ে আয়োজিত স্মরণসভায় প্রথম বর্ষ প্রথম সেমিস্টারের ছোটভাই সামি বলেন, ‘বিশ্বজিৎ ভাইয়ের মত আর যেন কেউ এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে না যায়’।

 

প্রথম বর্ষ ২য় সেমিস্টারের সুলতান বলেন, ‘বিশ্বজিৎদা আসলে অন্যরকম একজন ভাই ছিলেন। জুনিয়রদের ধমকাধমকি করতে একদমই জানতেন না। অনেক শান্ত প্রকৃতির লোক ছিলেন। ভাই আর আমাদের মাঝে নেই এই ব্যাপারটা ঠিক মানতে পারছি না। এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে। আমাদের পরিবার থেকে আর কোন সদস্য যেন এভাবে হারিয়ে না যায়’।

 

বিশ্বজিৎ এর সহপাঠী মিজান স্মৃতি রোমন্থন করতে যেয়ে আবেগ আপ্লূত হয়ে পরেন। তিনি বলেন, ‘সেদিন যখন আমার বন্ধুর ঝুলন্ত লাশ কাঁধে নিলাম তখন মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সবথেকে ভারী বোঝা কাধে নিচ্ছি। সবাই আমার বন্ধুর জন্য দোয়া করবেন। তাকে নিয়ে সমালোচনা না করে সে যেন পরকালে শান্তিতে থাকতে পারে সে জন্য প্রার্থনা করবেন’।

 

তার অপর সহপাঠী নাহিদ বলেন, ‘আমার আসলে কিছুই বলার নেই। সবাই ওকে ক্ষমা করে দিয়েন। ওর সাথে কারো কোন ধরনের আর্থিক লেনদেন থাকলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করে তা মিটিয়ে নেবেন। ও যদি কারো সাথে বিন্দুমাত্র খারাপ আচরণ করে থাকে তবে ওকে ক্ষমা করে দিয়েন। আমাদের বন্ধু যেখানেই থাকুক না কেন ভালো থাকুক’।

 

সহপাঠী রমজান বলেন, ‘যখন যেখানে ডেকেছি সে সবার আগে ছুটে এসেছে। কখনো রাগ করত না। আমরা কেবল ওর থেকে নিয়েই গিয়েছি। প্রতিদানে কখনো ওকে কিছু দেইনি। কখনো কিছু চাইতই না ছেলেটি। বেঁচে থাকতে আমরা বন্ধুটির জন্য কিছু করতে পারিনি। এই আফসোস সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। নিজের বিবেকের কাছে চিরদিন অপরাধী হয়ে থাকব। তার পরিবারের পক্ষ থেকে ওর সকল ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা চাওয়া হয়েছে। আর কোন বিশ্বজিৎকে যেন এমন সিদ্ধান্ত নিতে না হয়। বিশ্বর পরিবারের এখন একটাই দাবী ওর আত্মহত্যার প্রকৃত কারণটি যেন দ্রুত উন্মোচিত হয়’।

 

সহপাঠী রিফাত ইমতিয়াজ বিশ্বকে নিয়ে বলেন,’দুইটা বছর একসাথে ছিলাম আমরা। কখনো হাসি ছাড়া কথা বলতে দেখি নি। কখনো কাউকে বুঝতে দেয়নি ঐ হাসির আড়ালে লুকিয়ে রাখা কষ্টগুলো। অনেক স্মৃতি, অনেক কথা। ওর হাসিটা এখনও চোখে ভাসে।শেষবার আমার কাছে লাউয়াছড়া ট্যুরের ওর ছবিগুলো ফেইসবুকে চেয়েছিল। বলেছিল, দোস্ত তোর সময় হলে ছবিগুলো দিস আমাকে। তখন ব্যস্ততার কারণে আমি আমার বন্ধুর ইচ্ছাপূরণ করতে পারিনি। তখন কি জানতাম এটাই আমার কাছে তার শেষ আবদার হবে? গতবছর দুর্গাপূজায় বাড়ি গিয়েছিল সে। আসার সময় লাড্ডু নিয়ে এসে সবাইকে গ্রুপে পোস্ট দিয়ে টং-এ নিয়ে আসে। ছেলেটা সবসময় আমাদের নিয়ে চিন্তা করত। কখনো বলা লাগত না তাকে। নিজে থেকেই বাড়ি থেকে আসার সময় কিছু না কিছু নিয়ে আসতই সে। আর কখনই আসবে না বিশ্ব। ফোন দিয়ে বলবে না, দোস্ত আমিও তোদের সাথে ঘুরতে যাব। আমাদের ক্লাসের শেষ রোলটি আর কখনই ডাকা হবেনা। আমরা ৩৪ জনথেকে ৩৩ জন হয়ে গেলাম। একবার দোস্ত একবার বলতি তোর কী দুঃখ ছিল, প্রমিস দোস্ত এভাবে যাইতে দিতাম না তোরে’।

 

৩য় বর্ষের বড়ভাই সঞ্জয় বলেন, ‘যা করেছে তা মানার মত না। আমাদের কেবল দিয়ে গিয়েছে। বিনিময়ে কখনো কিছু দিতে পারিনি। দুইদিন আগে ওর সাথে যখন দেখা হয়েছিল জিজ্ঞেস করেছিলাম, ছোটভাই বাড়ি যাবি কবে? আসার সময় নাড়ু নিয়ে আসিস। সবাই প্রার্থনায় বিশ্বজিতের আত্মার মুক্তি কামনা করবেন।ওকে ক্ষমা করে দিয়েন। নয়তো ওর আত্মা কখনোই শান্তি পাবেনা’।

 

চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী অর্চিস্মান বলেন, ‘ছেলেটি সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানিনা আমি। শুধু মনে পড়ে যখনি দেখা হত একটা হাসি দিয়ে বলত, ভালো আছেন দাদা? নিঃসন্দেহে অনেক ভাল একজন ছেলে ছিল সে। আমরা সবাই কমবেশি হতাশায় ভুগি। তাই বলে আত্মহত্যা কখনোই এর সমাধান হতে পারে না। আমাদের উচিৎ একে অপরকে সর্বদা সহযোগিতা করা এমন পরিস্থিতি হতে বের করে আনার জন্য’।

 

এফইএস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জনাব মোঃ আবু সায়েদ আরফিন খান বলেন, ‘আমি ক্লান্ত। আজকে বিশ্বজিৎ যদি আমার কাছে আবদার করত সারা বাংলাদেশ তকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে। আমি এতটুকু ক্লান্ত হতাম না। কিন্তু এইভাবে ওকে ওর বাড়িতে নিয়ে যেতে হবে তা আমি কখনই চিন্তা করতে পারি নি। আমি আজকে সত্যিই অনেক বেশি ক্লান্ত। এ ক্লান্তি শারীরিক ক্লান্তি নয়। এ ক্লান্তি মানসিক, ব্যর্থতার। কী এমন দুঃখ ছিল তার যে ২১ বছর যাবত যে পিতামাতা লালন-পালন করেছে তাদের কথা চিন্তা না করে এভাবে সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেল? তোমাদের প্রতি একটাই অনুরোধ আমার যখনই মন খারাপ হবে, প্রচণ্ড হতাশা ভড় করবে তখন নিজের বাবা-মার কথা একবার চিন্তা করবে। পরিবারের কথা চিন্তা করবে। কখনই এ ধরনের রাস্তা বেছে নেবে না’।

 

এফইএস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জনাব সৌরভ দাস তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘তোমাদের মাঝে ইন্টারেকশন বাড়াও। শেয়ার কর নিজেদের সমস্যাগুলো আমাদের সাথে। আমাদের সাথে না পারলে নিজেদের বন্ধুদের সাথে। আর কেউ না হলে সব থেকে শ্রেষ্ঠ বন্ধু নিজের বাবা-মার সাথে। নিজের মধ্যে হতাশা চেপে রেখে এরকম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কখনই উচিত না। এতে সমস্যা সমাধান হয় না, বরং বাড়ে’।

 

বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞানের বিভাগীয় প্রধান ডক্টর এ জেড এম মঞ্জুর রাশিদ বিশ্বজিতকে নিয়ে তার স্মৃতিচারণ করার সময় বলেন, ‘একদিন বিশ্বজিতকে দুপুরের দিকে বিভাগের করিডোরে একা একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ডাক দিলাম। আমি সচরাচর কোন শিক্ষার্থীর সাথে এ ধরনের মজা করিনা। জানিনা কী কারণে সেদিন ওকে মজা করে বললাম, তুমি তো মেধাবী ছাত্র, দেখতে শুনতেও ভাল। তোমাকে তো বাংলা সিনেমার নায়কের চরিত্রে ভালো মানাবে। ছেলেটি এতটাই লাজুক ছিল যে সে আমাকে প্রত্যুত্তরে কিছু না বলে শুধু একটা মুচকি হাসি দিয়ে আমার সামনে থেকে চলে গেল। এই একটা স্মৃতিই আছে আমার কাছে ওর’। বিশ্বজিতের মৃত্যু এবং সুইসাইড নোট নিয়ে যেন কোন ধরনের বিভ্রান্তমূলক তথ্য প্রচার করা না হয় সে জন্য সকল গণমাধ্যম কর্মীদের অনুরোধ জানান তিনি।

 

বিশ্বজিতের স্মরণে তার সহপাঠীদের উদ্যোগে এবং বিভাগের সকলের সহযোগিতায় তার সকল স্মৃতি , লিখা এবং ছবি নিয়ে নিয়ে একটি দেয়ালিকা এবং বিভাগের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে একটি অ্যালবাম তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বিশ্বজিৎ চিরকাল বেঁচে থাকুক আমাদের মাঝে। সকলের হাসিতে আমরা আমাদের বিশ্বর হাসি ঠিক খুঁজে নেবো। আমরা আগেও ৩৪ জন ছিলাম, এখনও ৩৪ জনই থাকব। আমাদের বিশ্ব সবসময় আছে। এফইএস ১৬ তম ব্যাচ আমাদের ৩৪ জনের।

 

উল্লেখ্য ৭মে রাত ১১.৩০টায় খবর পেয়ে বিশ্বজিতের মেস থেকে ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে তার সহপাঠীরা। ময়নাতদন্ত শেষে তার লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ৯মে ভোর চারটায় তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

 

Share via email

ক্যাটাগরি অনুযায়ী সংবাদ

এই সংবাদটি ১০ মে ২০১৬ইং, মঙ্গলবার ১১টা ৩৬মিনিটে প্রবন্ধ, বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান, শীর্ষ সংবাদ, সর্বশেষ ক্যাটাগরিতে প্রকাশিত হয়। এই সংবাদের মন্তব্যগুলি স্বয়ঙ্ক্রিয় ভাবে পেতে সাবস্ক্রাইব(RSS) করুন। আপনি নিজে মন্তব্য করতে চাইলে নিচের বক্সে লিখে প্রকাশ করুন।

Leave a Reply

300 x 250 ad code innerpage

Recent Entries

120 x 200 [Sitewide - Site Festoon]
প্রধান সম্পাদক: সৈয়দ মুক্তাদির আল সিয়াম, বার্তা সম্পাদক: আকিব হাসান মুন

প্রকাশিত সকল সংবাদের দায়ভার প্রধান সম্পাদকের। Copyright © 2013-2017, SUSTnews24.com | Hosting sponsored by KDevs.com