360 x 130 ad code [Sitewide - Site Header]

ফাগুনের ২১আগুন!

Share via email

সুপর্ণ্য মৌঃ omor_21she
বিখ্যাত ভাষাবিদ হুমায়ুন আজাদ লিখেছিলেন, “ফাগুণটা খুব ভীষণ দুঃখী মাস, হাওয়ায় হাওয়ায় ছড়ায় দীর্ঘশ্বাস!” আজ ৮ই ফাল্গুন। ২১শে ফেব্রুয়ারি। এই দিনটির নেপথ্য-নাম শহীদ দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এই শব্দগুলোই বুকে ঘা দিয়ে জানান দেয় বাঙালীর সবচেয়ে গৌরবময় অস্ত্বিত্ব; তা হল পৃথিবীতে বাঙালীরাই একমাত্র জাতি যারা ভাষার জন্যে প্রাণ উৎসর্গ করেছে। মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মুহুর্তে সাথে সাথেই দৃশ্যপটে আনে এক বিদনাবিধুর হন্তা; ভাষা রক্ষার দাবিতে আন্দোলনের মিছিলে বর্বর গুলি নিক্ষেপে শহীদ ভাইয়েদের।

ভাষা আন্দোলন জোরালো হওয়ার পেছনে প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে ১৯৫২ সালের ২৭শে জানুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের ভাষণ। জিন্নাহর উক্তি “উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।” নাজিমুদ্দিনের কন্ঠে এরই প্রতিফলিত বয়ান আসে রেডিওতে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়ে, “কোন জাতি দুটি রাষ্ট্রভাষা নিয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারেনি।” অথচ পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষের মুখের ভাষা ছিল বাংলা এবং খোদ পশ্চিম পাকিস্তানেও তাই। কিন্তু সবদিক দিয়ে বঞ্চিত পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালী অন্তত মায়ের মুখের ভাষা নিয়ে কোনপ্রকার জোরজবরদস্তি সহ্য করতে পারেনি।

২৯শে জানুয়ারি প্রতিবাদ সভা এবং ৩০শে জানুয়ারি ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট পালন করে।সেদিনই ছাত্র নেতৃবৃন্দ ২১শে ফেব্রুয়ারি প্রদেশব্যাপী হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। সকাল ৯টা থেকেই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে এসে জড়ো হয়। তারা ১৪৪ ধারা জারির বিপক্ষে স্লোগান দিতে থাকে এবং পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের সদস্যদের ভাষা সম্পর্কে সাধারণের মতকে মেনে নেয়ার আহবান জানাতে থাকে। বিভিন্ন অনুষদের ডীন এবং উপাচার্য সেসময় উপস্থিত ছিলেন। প্রথমে কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ে বাধা দিতে চায় পুলিশ। পরে কিছু ছাত্ররা ইটপাটকেল ছুঁড়তে শুরু করলে রাওয়ালপিন্ডির নির্দেশে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। গুলিবর্ষণে আবদুল জব্বার ও রফিক উদ্দিন ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে অফিস-আদালত,রেডিও শিল্পীরা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে ধর্মঘট আহবান করেন। বিকালের আরেকবার ৩০হাজার লোকের এক বিশাল মিছিল বের হয় কার্জন হলের দিকে।সেই মিছিলেও পুনরায় গুলিবর্ষণে শহীদ হন শফিউর রহমান, ওয়াহিদুল্লাহ, আবদুল আউয়াল, সালাম এমনকি অহিদুল্লাহ নামের এক নয় বছরের শিশু। নাম না জানা আরো অনেকের লাশ পুলিশ ঘটনাস্থল থেকেই গুম করে ফেলে। একমাত্র আবুল বরকতের মা ছাড়া কাউকে লাশ দেখার সু্যোগ দেয়া হয়নি।

প্রথম শহীদ মিনার ছাত্ররা তৈরি করে ২৪ ফেব্রুয়ারি। ওইদিনই ভোরে মিনার বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পিত হয়। শহীদ শফিউরের পিতা আনুষ্ঠানিকভাবে শহীদ মিনারের উদ্বোধন করেন। ২৬ ফেব্রুয়ারি পুলিশ ও সেনাবাহিনী সরকারের নির্দেশে মিনার ভেংগে ফেলে।

“২১শে ফেব্রুয়ারি”– এ অমর গানটির সৃষ্টি ২১ তারিখের গুলিবর্ষণের পর। গানটি লিখেন আবদুল গাফফার চৌধুরী। প্রথমে সুর দেন আবদুল লতিফ ,কিন্তু করাচি থেকে ঢাকা ফিরে গানটিতে পুনরায় সুরারোপ করেন আলতাফ মাহমুদ। একুশের প্রভাতফেরীর গান তৎকালীন সরকার বাজেয়াপ্ত করলেও প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান তার “জীবন থেকে নেয়া” ছবিতে গানটি ব্যবহার করেন। ১৯৯৯ সালের ১৭নভেম্বর জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” হিসেবে স্বীকৃতি দেবার পর এই গানটিও আন্তর্জাতিকতা পেতে শুরু করে।

১৯৫৬ সালেই প্রথম সরকারের প্রচ্ছন্ন সহযোগিতায় ২১শে ফেব্রুয়ারি পালিত হয়। বাংলাকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয় ২৯ফেব্রুয়ারী ১৯৫৬ সালে। সংবিধানের ২১৪(১) অধ্যায়ে লেখা হয়, “The State language of Pakistan shall be Urdu and Bengali.” এত অর্জনের পর তবুও আমরা প্রভাতফেরীতে গাই, “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?” কারণ একটাই আর তা হল, “ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু জড়ায়ে ফেব্রুয়ারি…” মায়ের মুখের ভাষাকে রক্ষা করতে আমাদের ভাইয়েরা ফাগুনের রাজপথে টুপটাপ পলাশের মত লুটিয়ে পড়েছিলেন। সেই সাহসী সূর্যসন্তানদের জন্যই আজ আমরা চোখে জল অথচ বুকভর্তি দৃপ্ত চেতনা নিয়ে মাথা উঁচু করে বাংলায় কথা বলি, আজ আমরা বাঙালী, বাংলাদেশী। তাঁদের আত্মত্যাগ আর মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা বহতা হচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। সেই ‘৫২র মত রাত জেগে খালি পায়ে হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে সমগ্র জাতি হেঁটে যায় শহীদ মিনারে, যেখানে ঘুমিয়ে আছেন বাংলামায়ের ভাষাসন্তানেরা। শত সালাম আপনাদের। আজ আপনাদেরই জন্য এদেশ বাংলায় বলতে পারে, লিখতে পারে। আজ আপনাদের দেখেই অনুপ্রাণিত হয়ে পৃথিবীর অন্যপ্রান্তের এক দেশ- সিয়েরা লিয়ন তাদের দ্বিতীয় মাতৃভাষা হিসাবে বাংলাকে স্বীকৃতি দেয়! আপনাদেরই জন্য সারা পৃথিবী এ দিনটা পালন করে নিজেদের ভাষার প্রতি মাতৃটান অনুভব করে। বাঙালী জাতি কখনোই আপনাদের ভুলবেনা।

Share via email

ক্যাটাগরি অনুযায়ী সংবাদ

এই সংবাদটি ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ইং, রবিবার ১১টা ২৮মিনিটে মিশ্র সংবাদ, শীর্ষ সংবাদ, সম্পাদকীয়, সর্বশেষ ক্যাটাগরিতে প্রকাশিত হয়। এই সংবাদের মন্তব্যগুলি স্বয়ঙ্ক্রিয় ভাবে পেতে সাবস্ক্রাইব(RSS) করুন। আপনি নিজে মন্তব্য করতে চাইলে নিচের বক্সে লিখে প্রকাশ করুন।

মন্তব্যসমূহ

120 x 200 [Sitewide - Site Festoon]
প্রধান সম্পাদক: সৈয়দ মুক্তাদির আল সিয়াম, বার্তা সম্পাদক: আকিব হাসান মুন

প্রকাশিত সকল সংবাদের দায়ভার প্রধান সম্পাদকের। Copyright © 2013-2017, SUSTnews24.com | Hosting sponsored by KDevs.com